বউ পেটানো কূটনীতিক!

বউ পেটানো কূটনীতিক!
সেগুনবাগিচার সাদা বাড়িটার কূটনীতিক মহলে একজনকে নিয়েই সব আলোচনা চলছে। তিনি বউ পেটানো কূটনীতিক হিসেবে স্বনামখ্যাত। বউ পেটানো ছাড়াও তার অনেক অনাচার তাকে এখন দেশ-বিদেশে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু করে তুলেছে।

শীর্ষ পর্যায়ের এই কূটনীতিকের সঙ্গে অতীতে আওয়ামী লীগের কোনো সংযোগ না থাকলেও সাদা বাড়িটায় তিনিই এখন মূল সিদ্ধান্ত দেওয়ার মালিক। স্ত্রী নির্যাতনের অভিযোগে চাকরি থেকে বহিষ্কৃত তিনি ওই ঘটনাকে চাতুরীর সঙ্গে ব্যবহার করে হয়ে গেছেন ‘বিএনপি সরকারের হাতে নির্যাতিত কর্মকর্তা’। ফলত এখন তিনি মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক নেতৃত্বের চেয়েও শক্তিশালী, বদলি-নিয়োগ-সিদ্ধান্ত-কৌশল সব ক্ষেত্রেই সর্বেসর্বা।

জানা যায়, পেশাদার কূটনীতিকদের ভাগ্য নিয়ন্ত্রের ভূমিকা নেওয়া এই ক্ষমতাবানের ভাণ্ডারে রয়েছে বাংলাদেশ, ব্যাংকক, জেনেভা ও লন্ডন মিশনে জুনিয়র কূটনীতিক পদে স্বল্পকাল দায়িত্ব পালন করার অভিজ্ঞতা।
এর মধ্যে লন্ডন মিশনে বদলি হয়ে গোল বাধিয়ে ফেলেন। জড়িয়ে যান স্ত্রী নির্যাতন, আর্থিক কেলেঙ্কারিসহ নানান অনাচারে। লন্ডন হাইকমিশনে চাকরিরত কর্মকর্তার অন্যায় আচরণের প্রেক্ষিতে সুবিচার চেয়ে ১৯৯৩ সালের ২৭ জুলাই পররাষ্ট্র সচিবের কাছে করা হয় আনুষ্ঠানিক অভিযোগ।

ধানমন্ডি আবাসিক এলাকার জহুরুল খালেদের মেয়ে রাহীন সেই অভিযোগে বলেন, ‘১৯৮৯ সালের ৩০ জুলাই আমাদের বিয়ে হয়। বিয়ের রাত থেকেই নানাভাবে আমার সঙ্গে অসদাচরণ ও দুর্ব্যবহার করতে থাকে। লন্ডনে বদলি হওয়ার পর ১৯৯০ সালের ২ মার্চ সে আমাকে লন্ডন নিয়ে যায়।

সেখানে সে আরও বেশি মাত্রায় অসদাচরণ ও দুর্ব্যবহার করতে থাকে। নানাভাবে মানসিক নির্যাতন ও মাঝে মাঝে শারীরিক নির্যাতনও চলতে থাকে। প্রায়ই বাসা থেকে বের করে দেওয়ার হুমকিও দিত। একদিন মাঝরাতে সে আমাকে বাসা থেকে বের করে দেওয়ার চেষ্টা করে।

পরে ঢাকা থেকে আমার আব্বা টেলিফোনে যুক্তরাজ্যে বসবাসরত আমাদের আত্মীয় আবদুল্লাহ জুবায়ের চৌধুরী সাহেবের বাসায় আমাকে পৌঁছে দিতে বলেন। পরদিনই সে আমাকে জুবায়ের সাহেবের কাছে পৌঁছে না দিয়ে তার বাসার সামনে রাস্তায় নামিয়ে দিয়ে চলে যায়। সে সময় আমি পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলাম।’

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দেওয়া এ অভিযোগ পরে মহিলাবিষয়ক অধিদফতর (তৎকালীন) হয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আসে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যাওয়ায় ‘ক্ষমতাধর কূটনীতিক’-এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।

তার স্ত্রীর অভিযোগপত্রে বলা হয়, ‘আত্মীয় জুবায়ের সাহেবের বাসায় আমি দুই সপ্তাহ অপেক্ষা করি। সেখান থেকে কয়েকবার ফোনে আমি তার সঙ্গে যোগাযোগ করি। আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার কোনো উদ্যোগই যখন সে নিল না, তখন তাকে জানিয়েছিলাম যে, বাংলাদেশে ফিরে যাওয়া ছাড়া আমার আর কোনো উপায় নেই। এরপর বাধ্য হয়ে টিকিটের টাকা ধার করে বাংলাদেশে আমার আব্বা-আম্মার কাছে ফিরে আসি। এসেই ঢাকায় পৌঁছানোর সংবাদ ফোনে তাকে জানিয়েছি।

ঢাকায় আসার তিন মাস পর আমাদের একটি পুত্রসন্তান হয়। আমার আব্বা এই সংবাদ তখনই আমার স্বামীকে টেলিফোনে জানিয়ে দেন। আমিও তাকে পরে সব সংবাদ জানাই।
এরপর থেকে আজ পর্যন্ত যখন আমাদের সন্তানের বয়স ১১ মাস চলছে, সে আমার খবর নেওয়া তো দূরের কথা, একটি বারের জন্যও ছেলের খোঁজ নেয়নি।’ সাবেক স্ত্রীর অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়, একদিকে সে এভাবে আমার ওপর নির্যাতন করেছে, অন্যদিকে তার গাড়ি কেনা, পোশাক-পরিচ্ছদ, ক্রেডিট কার্ডের বিল পরিশোধ, ব্যক্তিগত ঋণ পরিশোধ ইত্যাদি যে চাহিদার কথা আমার মাধ্যমে এবং নিজেও আমার আব্বা-আম্মাকে জানিয়েছে, শত কষ্ট হলেও তারা সেসব চাহিদা পূরণ করেছেন। এভাবে বিভিন্ন সময়ে তাদের কাছ থেকে প্রায় এক লাখ বিশ হাজার টাকা আদায় করেছে। লন্ডন হাইকমিশনের একজন স্টাফের ঢাকার ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে দুবার তাকে যে টাকা দেওয়া হয়েছিল, সে টাকা জমা দেওয়ার রসিদ আছে।

ওই টাকা আমার স্বামী জমা দিতে বলেছিল, সে প্রমাণও আছে। এ ছাড়া আমি আমার ও বাচ্চার ভরণপোষণ, চিকিৎসা ইত্যাদি খরচাদি চেয়েও আমার রেখে আসা প্রায় বিশ ভরি স্বর্ণালঙ্কার এবং আমার অন্যান্য ব্যবহার্য জিনিসপত্র আমাকে পাঠিয়ে দেওয়ার জন্য রেজিস্ট্রি চিঠি দিয়েছি। এরপরও তাকে তাগাদা দিয়েছি।

কিন্তু সে কিছুই করেনি। চিঠিতে আমার রেখে আসা জিনিসপত্রের একটা তালিকাও দিয়েছিলাম। আমার স্বর্ণালঙ্কারগুলো হাইকমিশনের লকারে রক্ষিত ছিল। ওই লকার সবসময় সে-ই হ্যান্ডেল করত। প্রথমে সে লিখিতভাবে স্বীকার করেছিল যে, স্বর্ণালঙ্কার ও অন্যান্য জিনিস সব ঠিকমতো আছে।

কিন্তু পরবর্তীতে সে অস্বীকার করে বলেছে যে, সব কিছু আমি নিয়ে এসেছি, যা সম্পূর্ণভাবে মিথ্যা। আরও বলেছে যে আমি আসার সময় সে নগদ ৪০০ পাউন্ড আমাকে দিয়েছে এটাও সম্পূর্ণ মিথ্যা।’

একই বিষয়ে মহিলা অধিদফতরের সচিবের মাধ্যমে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন সচিবের কাছে লেখা চিঠিতে রাহীন খালেদ লিখেছেন, ‘নারী ও শিশু নির্যাতনের দায়ে সন্দেহাতীতভাবে সে দোষী। যে পিতা তার সন্তানের মুখ একটিবারের জন্যও দেখার তাগিদ অনুভব করে না, সে পিতা নামের কলঙ্ক।’

নির্যাতিত হয়ে স্ত্রী রাহীন যখন বিচারপ্রার্থী তার কিছুদিনের মধ্যেই লন্ডন মিশনের ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে হয়রানি ও পাসপোর্ট বাণিজ্যের লিখিত অভিযোগ করেন যুক্তরাজ্যের ১৬০ প্রবাসী বাংলাদেশি।

কর্মকর্তার নাম উল্লেখ করে ছয় পাতার লিখিত অভিযোগপত্রে বিভিন্ন ঘটনার প্রেক্ষিতে স্বেচ্ছাচারিতা, আর্থিক লেনদেনে পাসপোর্ট বিতরণ, ক্ষমতার দাপট, খামখেয়ালি, হয়রানি এসব শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। পাসপোর্ট বাণিজ্য বিষয়ে অভিযোগ ওঠায় আনুষ্ঠানিক তদন্ত করতেও বাধ্য হয়েছিল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

অভিবাসীদের মানবাধিকারের একজন সক্রিয় প্রবক্তা হিসেবে বর্তমানে সুপরিচিত এ কর্মকর্তা বহিষ্কারের পর চলে যান আন্তর্জাতিক সংস্থায়। দীর্ঘ সময় পরে ফরিদপুরের ত্যাগী কর্মকর্তা হিসেবে হর্তাকর্তা রূপে ফেরত আসেন।

সম্প্রতি তার বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে একটি লিখিত অভিযোগে বলা হয়, ‘মন্ত্রণালয়ে তিনি স্বেচ্ছাচারিতা ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে এবং কতিপয় কর্মকর্তার সিন্ডিকেট গঠন করে একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছেন।

তার কারণে স্বাধীনতার পক্ষের ও মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা কোণঠাসা এবং চরম অবহেলিত। তিনি বিএনপিপন্থি রাষ্ট্রদূতদের (সুইজারল্যান্ড, জার্মানি, মালয়েশিয়া) মুক্তিযোদ্ধা কর্মকর্তাদের (এম আতিকুর রহমান, আবদুল হান্নান, এম ওয়াহিদুর রহমান ইত্যাদি) অসম্মানজনকভাবে বিদায় করেছেন।

একইভাবে স্বাধীনতার পক্ষের কর্মকর্তাদের নিষ্ক্রিয় করে বিএনপি-জামায়াতীদের তিনি মন্ত্রণালয় ও মিশনের জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন করেছেন। অভিযোগ ব্যাচের প্রথম/শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তাদের আফ্রিকা/মধ্যপ্রাচ্যে (ইথিওপিয়া, মিসর, লিবিয়া, ব্রাজিল ইত্যাদি) পদায়ন এবং পেছনের সারির কর্মকর্তাদের আমেরিকা ও ইউরোপ (ওয়াশিংটন, লন্ডন, সিউল) পদায়নের মাধ্যমে পুরস্কৃত করেন। পোস্টিং বাণিজ্যের নামে অর্থ গ্রহণ, মাসোহারা ও দামি উপহারের মতো ন্যক্কারজনক অভিযোগও আছে তার বিরুদ্ধে। ভিন্নমত পোষণ করার কারণে প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে ‘জুনিয়র কর্মকর্তাদেরও বিভাগীয় মামলায় জড়ানোর অভিযোগ’ করে প্রভাবশালী এ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ দেওয়া হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে।

loading...

নামাজের সময়সুচী

ফজর ভোর ০৪:৩৬ মিনিট
যোহর বেলা ১১:৫৩ মিনিট
আছর বিকেল ০৪:১১ মিনিট
মাগরীব সন্ধ্যা ০৫:৫৪ মিনিট
এশা রাত ০৭:০৯ মিনিট
সেহরী ভোর
ইফতার সন্ধ্যা

আর্কাইভ

নির্বাচিত সংবাদ