পাউবোর জমিতে অবৈধ স্থাপনা,শরণখোলায় যুগ যুগ ধরে অবরুদ্ধ ৩০ পরিবার!

Sharonkhola

আব্দুস-সবুর হাওলাদার (৫৭), জন্ম থেকেই শারিরীক ভাবে প্রতিবন্ধী হওয়ায় ভিক্ষা করে জীবিকা নির্বাহ করেন। দীর্ঘ ৪০ বছর পুর্বে জীবিকার প্রয়োজনে সুন্দরবনের ভোলা নদীর চর হতে উপজেলা সদর রায়েন্দা বাজারে আসেন তিনি সহ তার পরিবার।

সে সময় মাথা গোঁজার মতো তার কোন ঠাঁই না থাকায় তৎকালীন শরনখোলা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমানের কাছে নানা অনুনয় বিনয় করে উপজেলা সদরের রায়েন্দা সরকারী পাইলট হাইস্কুল সংলগ্ন জেলা পরিষদের জমি ইজারা নিয়ে সেখানে একটি খুপরি ঘর তৈরী করে পরিবার নিয়ে বসবাস শুরু করেন। পরবর্তীতে, ওই এলাকায় বসতি গড়ে তোলেন রায়েন্দা সরকারী পাইলট হাইস্কুলের চতুর্থ শ্রেনীর কর্মচারী মোজাহার খাঁন, আইয়ুব আলী মোল্লা।

সেখানে আবার কয়েক বছর পর হাইস্কুল কর্তৃপক্ষ নির্মান করেন উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষক-কর্মচারীদের (সমিতির) একটি নিজস্ব ভবন।

এদিকে ২০০৭ সালের মহ-প্রলয়কারী ঘুর্নিঝর সিড়রে সব কিছু হারিয়ে ওই উপজেলার বহু পরিবার নিঃস্ব হয়ে যান প্রানহানী ঘটে বিভিন্ন পেশার সহা¯্রাধিক মানুষের। ঘুর্নিঝর পরবর্তী পুনঃবাসনের সময় সরকারী ওই জমিতে ভিক্ষুক সবুরকে ভারত সরকারের অনুদানের একটি ঘর নির্মান করে দেন তৎকালীন বাগেরহাট জেলা প্রসাশক ও শরনখোলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা।

অন্যদিকে, সিড়রের পাঁচ বছর পর ২০১২ সালে শরনখোলার (ইউএনও) হিসেবে যোগদান করেন কে.এম.মামুন উজ্জামান নামের একজন কর্মকর্তা। তার কিছুদিন পর স্কুল সংলগ্ন এলাকার অধিকাংশ অসহায় পরিবারের ভাগ্যে নেমে আসতে শুরু করে দুঃখের গনঘটা।

অনুসন্ধানে জানাযায়, শিক্ষার মান উন্নয়নের জন্য (ইউএনও) মামুন উজ্জামান ওই সময় উপজেলা সদরে অবস্থিত ভাসানী কিন্ডার গার্ডেন নামের একটি বে-সরকারী ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল স্থাপন শুরু করেন এবং স্কুলটির নাম পরিবর্তন করেন ।

এতে শিক্ষক ও ম্যানেজিং কমিটির সদস্যরা চরম বিরোধীতা করেন। এক পর্যায়ে (পুনরায়) ভাসানীর নামটি লিখতে বাধ্য হন (ইউএনও)। সেই লাঞ্চনার বদলা নিতে ২০১৪ সালে মামুনউজ্জামান তার ক্ষমতা অপব্যাবহার করে উপজেলা সদরের রায়েন্দা সরকারী পাইলট হাইস্কুল সংলগ্ন পানি উন্নয়ন বোর্ডের ৩৫/১ পোল্ডারের রাস্তার পার্শে দীর্ঘদিন ধরে বসবাসরত বহু অসহায় পরিবারকে সরকারী কোন আদেশ ছাড়াই স্থানীয় একটি লোভী প্রভাবশালী চক্রের কু-পরামর্শে শরনখোলা আইডিয়াল ইনষ্টিটিউট নামের একটি বেসরকারী কিন্ডার গার্ডেন এবং অবৈধ মার্কেট নির্মানের পরিকল্পনা করেন।

পরবর্তীতে, পুলিশ ও আনসার ভিড়িপি সদস্যদের ব্যাবহার করে অসহায় মানুষের উপর নির্যাতন চালিয়ে উচ্ছেদ কার্যক্রম শুরু করেন। ওই সময় উপজেলার খোন্তাকাটা ইউনিয়নের নলবুনিয়া গ্রামের বাসিন্দা মজিদ হাওলাদারের মেয়ে স্বামী পরিত্যাক্তা খাদিজা বেগম (৪০) তার ঘুপড়ি ঘরটি বাঁচাতে মামুুনউজ্জামানের কাছে কিছু দিনের সময় চান।

কিন্তুু তাকে কোন সময় না দিয়ে উল্টো অসহায় খাদিজাকে গলা ধাক্কা দিয়ে তার অফিস হতে বের করে দেন ইউএনও। পরে ক্ষিপ্ত হয়ে তিনি ২০১৪ সালের ১৩ এপ্রিল অসহায় খাদিজার বিরুদ্ধে মোবাইল কোর্ট বসিয়ে প্রকাশ্য দিবালোকে স্থানীয় শত শত মানুষের সামনে মহিলা আনসার দিয়ে টেনে-হিজড়ে তার শিল্লতাহানী করে এবং পিটিয়ে অমানুবিক ভাবে উচ্ছেদের পাশাপাশি তার একমাত্র মাথা গোঁজার ঠাঁই টুকু গুড়িয়ে দিয়ে (ইউএনও) সহ তার সহযোগী দালালরা উল্লাস করেন।

এসময় স্থানীয় সাংবাদিকরা ঘটনাস্থলে হাজির হলে তিনি দম্ভউক্তি করে বলেন, পত্রিকায় লিখলে কিছুই হয়না। তৎকালীন সময়ে মামুন উজ্জামানের বর্বরতার শিকার হয়ে খাদিজা চিকিৎসার জন্য শরনখোলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্য ভর্তি হলে সেখান থেকেও তাকে বের করে দেন তিনি।

কেবল মাত্র খাদিজা নয় তার ক্ষমতার অপব্যাবহারের যাতা কলে পড়ে পিষ্ট হয়েছে সেই সময়ের ব্যাবসায়ী রশিদ পঞ্চায়েত, বাবুল শীল, হুমায়ুন কবির, ইউনুচ মোল্লা, মনির তালুকদার, আকাদুল, ওবায়দুল হক সহ অনেকে। পরে তিনি উপজেলার ড্রেজার ব্যাবসায়ীদের উপর চাপ প্রয়োগ করে পাউবোর অনুমতি ছাড়া প্রায় ৮০ শতক (২৫) কাঠা জমিতে অবৈধ ভাবে বালু ভরাট করে জবর দখল করে নেয়। অপরদিকে, কিন্ডার গার্ডেন স্কুলটির সীমানা প্রাচীর করে চারদিক ঘিরে ফেলায় যাতায়াতের পথ বন্ধ হয়ে যায়, স্থানীয় বাসিন্দা ছালে আহম্মদ গাজী, রউফ গাজী, মাসুদ আলী, গফফার, আলী হোসেন সহ অনেক পরিবারের।

এখন উপজেলা সদরের সরকারী পোষ্ট অফিসটিও গেলার উপক্রম হয়ে উঠেছে। তাছাড়া নিয়ম নিতীর তোয়াক্কা না করে ওই সম্পত্তির উপর মামুনউজ্জামান গড়ে তুলেছেন বহুতল ভবন সহ ব্যবসায়ীক বিশাল মার্কেট। এ ব্যাপারে, সংশ্লিষ্ট এলাকার বাসিন্দা ভিক্ষুক সবুর হাওলাদার বলেন, প্রায় ৪০ বছর ধরে আমি এই জায়গায় পরিবার নিয়ে থাকি এবং ভিক্ষা করে খেয়ে না খেয়ে কোন ভাবে বেঁচে আছি। এখন শুনি আইড়িয়াল স্কুলের বড় বিল্ডিং হবে।

মোরা কেউ আর এখানে থাকতে পারমুনা। মোরা তো অসহায় যামু কোথায়। বর্তমান (ইউএনও) স্যার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (কইছে) বলছেন, ৭ দিেেনর মধ্যে সরে যাবা। তা না হলে তোমাদের নামে মামলা হবে। সেখানকার ভূক্তভোগীরা বলেন, শুনেছি সবার উপর নাকি মানুষ সত্য, তাহার উপর কিছু নাই।

এ কথা এখন আর ভুমি দস্যুরা মানে না। কারন আইড়িয়াল স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা শরনখোলা উপজেলার (সাবেক) নির্বাহী কর্মকর্তা কে.এম.মামুনউজ্জামান (সাহেব) সাধারন মানুষের সম্পদ রক্ষা না করে উল্টো তিনি আমাদের ক্রয়করা জমির পাশাপাশি পানি উন্নয়ন বোর্ডের ৩৫/১ পেল্ডারের ২৫ কাঠা সম্পত্বি ২০১৪ সালে জবর দখল করে সেখানে দেয়াল তুলে দিয়েছেন। যার কারনে আমাদের প্রায় ৩০ টি পরিবারের যাতায়াতের পথ বন্ধ রয়েছে। এখন আমরা এক প্রকার অবরুদ্ধ হয়ে আছি।

মামুন সাহেব এ উপজেলা হতে ৫/৬ বছর পুর্বে অন্যত্র বদলী হয়ে গেলেও সেখানে বসে সকল কল কাঠি নাড়ছেন তিনি। তাছাড়া এখানে যে (ইউএনও) আসেন তখন তাকে চাপ দিয়ে আমাদের নামে বিভিন্ন মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করান। এমনকি জেল জরিমানার ভয় দেখান। এই সম্পত্বি বিবাদে এ পর্যন্ত আমরা ১২ টি মিথ্যা মালার শিকার হয়েছি। কিন্তুু আমাদের রেকড়ীয় সম্পত্বি ফেরৎ কিংম্বা যাতায়াতের রাস্তা আজও দেননি সংশ্লিষ্টরা।

যে কারনে গত ৭ বছর ধরে বিষয়টি নিয়ে আমরা চরম হয়রানির মধ্যে আছি। এছাড়া আমাদের সহযোগীতায় কেউ পাশেও দাড়াচ্ছে না। দেশের অবস্থা এখন এমন হয়েছে কোথাও গিয়ে ন্যায় বিচার পাওয়া যাচ্ছে না। এমনকি মামুনউজ্জামানের সহযোগীরা ইতিপুর্বে অন্যায়ভাবে আমাদের মারপিট করে দোকানের মালামাল গুড়িয়ে দেয় কিন্তুু মামলা করতে গেলে তা পুলিশ নেয় না।

এখন এমন অবস্থা হয়েছে যে পরিবারের কেউ মারা গেলে খাটিয়ায় করে যে তার লাশ বের করব এর ও কোন পথ নাই। তাই বাধ্য হয়ে এখন বাড়ি বিক্রির সাইন বোর্ড ঝুলিয়ে দিয়েছি। আমাদের সর্বনাস করে এখন সবুর সহ ছিন্নমুলদের তাড়াতে ব্যস্ত হয়ে উঠেছেন মামুন সাহেবের প্রভাবশালী সহযোগীরা।

এছাড়া রায়েন্দা সরকারী পাইলট হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক সুলতান আহম্মেদ গাজী বলেন, উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির ভবন এবং সবুর সহ কয়েকজন বাসিন্দা জেলা পরিষদের জমিতে বসবাস করছেন। সে ক্ষেত্রে ওই সম্পত্তি উপর দাবী থাকলে জেলা পরিষদ কর্তৃপক্ষের থাকতে পারে।

এখানে আইড়িয়াল স্কুল কোন জমি দাবী করতে পারে না। তাছাড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান করতে গিয়ে কোন মানুষকে কাাঁদানো বা কষ্ট দেওয়া কারো ধর্ম হতে পারে না। একটি স্বার্থেন্নেষী মহল (নবাগত) নির্বাহী অফিসারকে ভুল বুঝিয়ে জেলা পরিষদের ওই জমি হাতাতে চাইছেন।

অন্যদিকে, ঢাকাস্থ দ্বীপ্তবাংলা হিউম্যান ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ও শরনখোলা উপজেলার বাসিন্দা আওয়ামীলীগ নেতা রেজাউল করিম খান রেজা জানান, সাবেক (ইউএনও) মামুনউজ্জামান একজন দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা তিনি শরনখোলা উপজেলায় দ্ধায়িত্ব পালন কালে ক্ষমতার অপব্যাবহার করে পাউবোর অনুমতি ছাড়া তাদের প্রায় ১০ কোটি টাকার সম্পত্বি জবর দখল করে তাতে নিয়ম বর্হিভুত ভাবে স্কুল ও মার্কেট নির্মান করেছেন এবং তার নির্যাতনের শিকার হয়ে বহু পরিবার নিঃশ্ব হয়েছে। ওই কর্মকর্তা সহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আমি বাদী হয়ে হাইকোর্টে মামলা করেছি।

যা বিচারাধীন রয়েছে এবং সকল অপকর্মের জবাব মামুনউজ্জামানের আদালতে দিতে হবে ইনশআল্লাহ। এ সকল বিষয়ে জানতে চাইলে শরনখোলা আইড়িয়াল ইনষ্টিটিউটের সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সরদার মোস্তফা শাহিন জানান, সম্পত্বি নিয়ে স্কুলটির পিছনে বসবাসরত বাসিন্দাদের সাথে বিবাদ থাকায় যাতায়াতে তাদের সমস্যা হচ্ছে। উক্ত সমস্যা সমাধানের জন্য ইতিমধ্যে উদ্যেগ নেওয়া হয়েছে। উভয় পক্ষের কাগজ পত্র দেখে শীঘ্রই একটি চুড়ান্ত ফায়সালা দেওয়া হবে। তাছাড়া ওই স্কুলটি আমি প্রতিষ্ঠা করি নাই ।

সে ক্ষেত্রে পুর্বে কে কার সম্পত্বি জবর দখল করেছেন তা আমার জানা নাই। এছাড়া ভিক্ষুক সবুর সহ অন্যদের পুনঃবাসন করা হবে। তাই তাদের প্রস্তুতি নিতে বলা হয়েছে । তবে, সরকারী সম্পত্বি দখল মুক্ত করে তা কোন ব্যাক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে পাইয়ে দেওয়ার সুযোগ নাই।
মেহেদী হাসান শরনখোলা, বাগেরহাট।