টঙ্গীর সেই শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী ও প্রভাবশালী ছাত্রলীগ নেতা গ্রেফতার

Sattalique

গাজীপুর মহানগরের আলোচিত ছাত্রলীগ নেতা মো. রেজাউল করিম (৩৫) কে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে বুধবার ভোর রাতে গ্রেফতার করেছে টঙ্গী পূর্ব থানা পুলিশ। তাকে গ্রেফতারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন জিএমপির উপ-পুলিশ কমিশনার (অপরাধ দক্ষিণ) ইলতুৎমিশ।
জানা যায়, মো. রেজাউল করিম টঙ্গী সরকারী বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ ছাত্রলীগের প্রভাবশালী সাধারণ সম্পাদক এবং একইসাথে তিনি কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সহ-সম্পাদক। পাশাপাশি তিনি বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক ও গাজীপুর মহানগরের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়াও রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে রেল, সড়ক ও নৌপথে মাদক ব্যবসার অন্যতম ট্রানজিট পয়েন্ট টঙ্গী’র নিয়ন্ত্রণকারী, শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী। সে ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে গত কয়েকদিন দেশের শীর্ষ পত্রিকাগুলোতে সংবাদ প্রকাশ হওয়ার পর গত মঙ্গলবার ২৭ এপ্রিল রাত সাড়ে ১১টায় মাদকের ব্যস্ত ও ট্রানজিত রোড হিসেবে পরিচিত টঙ্গী রেলওয়ে জংশন সংলগ্ন এলাকা থেকে তার প্রধান সহযোগী নবীন হোসেন নামে একজন মাদক কারবারিকে আটক করে পুলিশ। তার কাছ থেকে ৭৭০ গ্রাম গাজা এবং ৫০০ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদে নবীন পুলিশের কাছে স্বীকার করেছে, উদ্ধারকৃত ৫০০ ইয়াবা বিক্রির উদ্দেশে রেজাউল করিম তাকে সরবরাহ করেছে, এঘটনায় মামলা হয়েছে। এছাড়াও রেজাউলের বিরুদ্ধে এরশাদ নগরের বাসিন্দা সাজ্জাদুল ইসলাম মনির নামে এক গার্মেন্টস ব্যবসায়ীর কাছে পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা দাবীর করেন ছাত্রলীগের এই নেতা। ভুক্তভোগীর স্ত্রী শিল্পী আক্তার এ ঘটনায় বাদী হয়ে টঙ্গী পশ্চিম থানায় অভিযোগ দায়ের করেন। এছাড়াও তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধারায় একাধিক মামলা রয়েছে। এসব ঘটনার পর উর্দ্ধতন কর্মকর্তাদের নির্দেশে এবং গোপন সংবাদের ভিত্তিত্বে বুধবার ভোর রাতে গ্রেফতার করেছে টঙ্গী পূর্ব থানা পুলিশ। গতকাল তাকে জিগ্ধসঢ়;গাসাবাদের জন্য আবেদন করে আদালতে পাঠানো হয়েছে। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, সম্প্রতি আলোচিত এই ছাত্রলীগ নেতার কাছে ১ লাখ পিচ ইয়াবা ট্যাবলেট মজুদ থাকা এবং একজন শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী মহিলার মাদক ব্যবসায়ী সংক্রান্তে তার ফোনালাপের একাধিক অডিও রেকর্ড ফাঁস হলে ব্যাপক গাজীপুরে ব্যপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়। টঙ্গীর চিহ্নিত ওই মাদক সম্রাজ্ঞী সাঈদা বেগমের সাথে তার আলোচিত ফোনালাপের রেকর্ডটি দেশের বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক পত্রিকা হুবহু প্রকাশ করে। এরপর থেকে ছাত্রলীগের ওই নেতার চাঁদাবাজিসহ আরো একাধিক অপকর্ম বেরিয়ে আসতে। এতে নড়েচড়ে বসে গাজীপুর মেট্রোর আইন শৃংখলা বাহিনী। অবশেষে বুধবার ভোর রাতে সাদা পোশাকে আইন-শৃংখলা বাহিনীর সদস্যরা ছাত্রলীগ নেতা ও শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী রেজাউল ও তার সহযোগী নবীন হোসেনকে নোয়াগাঁওয়ের একটি অফিস থেকে গ্রেফতার করে। পরে তাকে গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের টঙ্গী পূর্ব থানায় নেওয়া হয়। এ সময় থানার মূল ফটক সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়। জিএমপি পুলিশের উর্দ্ধতন কর্মকর্তারা দীর্ঘক্ষণ তাকে থানায় জিজ্ঞাসাবাদ করেন। টঙ্গী পূর্ব থানা পুলিশ জানায়, গত ১৯ এপ্রিল মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে টঙ্গী পূর্ব থানায় একটি মামলা (নং-৩৭) হয়। ওই মামলায় রিমান্ডে থাকা আসামী চিহ্নিত মাদক কারবারি জাকির হোসেন ওরফে ফরিদপুন্নীর ছেলে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদের জানায়, তার বাসায় আরো ইয়াবা ট্যাবলেট রক্ষিত আছে। তার স্বীকারোক্তি মতে উক্ত মাদকদ্রব্য উদ্ধারের জন্য গতকাল মঙ্গলবার রাতে জিএমপি টঙ্গী জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনারের নেতৃত্বে টঙ্গী রেলওয়ে জংশন সংলগ্ন অন্যতম প্রধান মাদক স্পট কেরানীরটেক বস্তিতে অভিযান চালায় পুলিশ। অভিযানকালে জাকিরের বসত ঘরের আলমিরা থেকে প্রায় দেড় লাখ টাকা মূল্যের ৫০০ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করা হয়। এ সময় জাকির পুলিশকে জানায়, এ সব ইয়াবা ট্যাবলেট ছাত্রলীগ নেতা রেজাউল করিম তাকে সরবরাহ করতো এবং দীর্ঘদিন যাবত রেজাউলের সরবরাহ করা ইয়াবা ট্যাবলেট সে ক্রয়-বিক্রয় করে আসছে। ইয়াবা ট্যাবলেট বিক্রয়ের লভ্যাংশ তারা রেজাউলের সাথে আনুপাতিক হারে ভাগ করে নিয়ে থাকে। উক্ত ৫০০ পিচ ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধারের ঘটনায় মঙ্গলবার রাতেই টঙ্গী পূর্ব থানায় ছাত্রলীগ নেতা রেজাউল ও তার সহযোগীদের নামে মামলা (নং-৫০) রজু করে পুলিশ।এরপর ওই রাতেই ছাত্রলীগ নেতা ও শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী রেজাউল করিমকে মাদকের ট্রানজিট রোড হিসেবে পরিচিত টঙ্গী রেলওয়ে জংশনের উত্তর পাশে নোয়াগাঁও সৈয়দ মুন্সী রোডে তার অফিসে অভিযান চালিয়ে গ্রেফতার করা হয়। পরে রেজাউলের দেয়া তথ্যমতে আরো মাদক দ্রব্য উদ্ধার অভিযানকালে গ্রেফতারকৃত মাদক কারবারি জাকির হোসেনের ভাই নবীন হোসেনকে (৪০) আরো ২৯৪ পুরিয়া গাঁজাসহ গ্রেফতার করা হয়। এঘটনায়ও মঙ্গলবার রাতেই টঙ্গী পূর্ব থানায় আরেকটি পৃথক মামলা (নং- ৫১) রজু করা হয়। এদিকে জিএমপি টঙ্গী পশ্চিম থানা সূত্রে জানা যায়, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের স্থানীয় এরশাদ নগর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অবস্থিত একটি পোশাক কারখানার ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিতে ব্যর্থ হয়ে সংশ্লিষ্ট গার্মেন্টস ব্যবসায়ীর কাছে ৫লাখ টাকা চাঁদা দাবী করে রেজাউল করিম। ওই ব্যবসায়ী চাঁদা দিতে রাজি না হওয়ায় তাকে হত্যার হুমকি দিয়ে ব্যবসা বন্ধ করে দেয়। ফলে তার হুমকিতে ওই ব্যবসায়ী নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছিলেন। ওই ব্যবসায়ীর স্ত্রী বাদী হয়ে স্বামীর জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে ছাত্রলীগ নেতা রেজাউল ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে টঙ্গী পশ্চিম থানায় গত ১৬ মার্চ একটি অভিযোগ দায়ের করেন। অবশেষে ওই অভিযোগ মঙ্গলবার টঙ্গী পশ্চিম থানায় এফআইআরভুক্ত হয়। যার মামলা নং- নং-২২, ধারা- ১৪৩/৩৪১/৩২৩/৩৮৫/১১৪/৩৪ পেনাল কোড। ছাত্রলীগ নেতা রেজাউলের সহযোগী মাদক কারবারি গ্রেফতারকৃত জাকির ও নবীন আমতলী কেরানীরটেক এলাকার মৃত হামিদ হাওলাদারের ছেলে। তাদের মা জয়তুন্নেছা স্থানীয়দের কাছে ফরিদপুন্নী নামে পরিচিত এবং জাকির ও নবীনকে স্থানীয়রা ফরিদপুন্নীর ছেলে বলে ডাকে। কে এই রেজাউল : রেজাউল করিমের বাবার নাম হোসেন আলী। তারা দীর্ঘদিন যাবত টঙ্গী রেলওয়ে জংশন এলাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে থাকতেন। স্থানীয়রা জানান, রেজাউলের বাবা টঙ্গী রেলস্টেশনের গোল চত্বর ফুটপাতে বসে কাপড় সেলাইয়ের কাজ করতেন। চার ভাই বোনের মধ্যে সবার ছোট রেজাউল পূবাইল আদর্শ কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। তিনি ২০০৭ সালে টঙ্গী সরকারি কলেজে ডিগ্রিতে ভর্তি হওয়ার পর পড়ালেখার খরচ জোগাতে চলনলি বাসের টিকিট কাউন্টারে কাজ নেন। টিকিট বিক্রির সুবাদে মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে যায় রেজাউল করিম। রেজাউল করিম প্রথমে ফেনসিডিল বিক্রি করতেন তিনি। একপর্যায়ে স্থানীয় প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলে টঙ্গী সরকারি কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক পদটি বাগিয়ে নেন। ছাত্রলীগের পদ পাওয়ার পর তার মাদক ব্যবসা নির্ভিঘœ হয়। এক পর্যায়ে ইয়াবার হোল সেলারে পরিণত হন তিনি। তার কাছ থেকে ইয়াবা কেনা বাধ্যতামূলক ছিল এলাকার খুচরা সব মাদক কারবারির। কক্সবাজারের মাদক মাফিয়াদের সাথেও রেজাউলের সুসম্পর্ক গড়ে উঠে। কক্সবাজার থেকে আনা কোটি টাকার ইয়াবার চালান নিয়ে সম্প্রতি টঙ্গীর মাদক সম্রাজ্ঞী সাঈদা বেগমের সাথে তার ফোনালাপে এসব তথ্য পাওয়া যায়। দলীয় একটি সূত্র জানায়, সাবেক টঙ্গী থানা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সফি আহমেদ সফির হাত ধরে ছাত্রলীগের রাজনীতি শুরু করেন রেজাউল। পরে প্রভাবশালী নেতাদের সাথে সু- সম্পর্ক গড়ে তুলে সফিকে কোনঠাসা করেন তিনি। এ জন্য দলে তিনি গুরুমারা শিষ্য হিসেবেও পরিচিত। তিনি ২০১৬ সালে মাদক বিক্রির টাকা খরচ করে টঙ্গী কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক পদ বাগিয়ে নেন বলে স্থানীয় ছাত্রলীগ নেতারা জানান। সাবেক টঙ্গী মডেল থানায় তার বিরুদ্ধে মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলাও রয়েছে। রেজাউল করিম পাঁচ বছর আগে বিয়ে করে সন্তানের বাবা হয়েছেন। তার ছাত্রত্ব নেই বেশ কয়েক বছর। তবুও ছাত্রলীগের পদ ধরে রেখেছেন। এছাড়াও কলেজ শাখা ছাত্রলীগের গুরক্বপূর্ণ পদটি বাগিয়ে নেওয়ার পর ফেনসিডিলের কারবার ছেড়ে দিয়ে ইয়াবার কারবার শুরু করেন। দলীয় পদ ব্যবহার করে টেকনাফ ও কক্সবাজার থেকে নিজের গাড়ি দিয়ে নির্ভিঘেœ ইয়াবার চালান নিয়ে আসতেন। মাত্র চার বছরের ব্যবধানে মাদকের টাকায় আঙ্গুল ফুলে গলাগাছে পরিণত হন তিনি। একপর্যায়ে ভাড়া বাসা ও ভবঘুরে জীবন ছেড়ে টঙ্গীর দত্তপাড়া হাফিজ উদ্দিন সরকার রোডে জায়গা কিনে নিজস্ব বাড়িতে উঠেন। এ ছাড়া দত্তপাড়া সাইদ মৃধা রোডে তিন কাঠা জমিতে একটি আধা পাকা বাড়িও করেছেন। উত্তরায়ও ফ্ল্যাট কিনেছেন বলে জানা গেছে। পরিবহন খাতেও বিপুল পরিমান টাকা তার বিনিয়োগ রয়েছে বলে শোনা যাচ্ছে। জিএমপির উপ-পুলিশ কমিশনার ইলতুৎমিশ বলেন, আলোচিত ওই ছাত্রলীগ নেতার মূল ব্যবসাই ইয়াবা। কক্সবাজার থেকে মাদক এনে টঙ্গীর বিভিন্ন কারবারিদের হাতে পৌঁছে দিতেন রেজাউল করিম। চাঁদাবাজিতেও নাম উঠে এসেছে এই ছাত্রলীগ নেতার। গাজীপুরের টঙ্গীর ব্যাংকের মাঠ বস্তি ও কেরানীর টেক বস্তি এলাকার মাদক ব্যবসার অন্যতম হোতা সাঈদা বেগম ইয়াবাসহ ডিবি পুলিশের হাতে গ্রেফতার হওয়ার ঘটনাকে ঘিরেই রেজাউলের মাদক সম্পৃক্ততার বিষয়টি আমাদের সময়ের নজরে আসে। জামিনে বাইরে থাকা সাঈদার সঙ্গে রেজাউলের মুঠোফোন আলাপে সাঈদার কথাতে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে, রেজাউলের মাধ্যমে কক্সবাজার থেকে এক লাখ পিস ইয়াবা এনে টঙ্গীতে সরবরাহ করা হয়েছে। ওই এক লাখ ইয়াবা বেহাত হওয়ার জন্য সাঈদাকেই দায়ী করেন এ ছাত্রলীগ নেতা। মাদকের সাথে সম্পৃক্ততা ও চাঁদাবাজির মামলায় রেজাউল করিমকে উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে গ্রেফতার করা হয়েছে।

মৃণাল চৌধুরী সৈকত, টঙ্গী