টঙ্গীতে ভূয়া ডেন্টাল ডাক্তার কর্তৃক অঙ্গহানীর জরিমানা মাত্র ৫ হাজার টাকা !

DENTAL CRIME TONGI

টঙ্গীতে ডেন্টাল চিকিৎসার নামে একটি দুষ্টু চক্র বছরের পর বছর সাধারণ রোগীদের সাথে প্রতারণা করে হাতিয়ে নিচ্ছে বিপুল অংকের টাকা। দুর-দুরান্ত থেকে দাঁতের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আসা সাধারণ রোগীদের ওইসব নামধারী এবং যোগ্যতাহীন ডেন্টাল চিকিৎসকরা নিজেদের অভিজ্ঞ ডেন্টাল ডাক্তার পরিচয় দিয়ে প্রকাশ্যেই ভূল চিকিৎসা দিয়ে অঙ্গহানীসহ বিভিন্ন ভাবে হয়রানীর অভিযোগ উঠেছে। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, টঙ্গীর ষ্টেশন রোডসহ বিভিন্ন এলাকায় ব্যাঙ্গের ছাঁতার মতো গজিয়ে উঠা বিভিন্ন নামে বে-নামে ডেন্টাল ক্লিনিকগুলোর মালিকরা শিক্ষা বা অভিজ্ঞতা সনদ কিংবা সরকারী অনুমোদন বিহীন ডেন্টাল ক্লিনিক বসিয়ে নিজেদের অভিজ্ঞ ডেন্টাল ডাক্তার পরিচয় দিয়ে প্রকাশ্যেই ভূল চিকিৎসা দিয়ে সাধারণ মানুষদের অঙ্গহানীসহ বিভিন্ন ভাবে হয়রানী করছে। সেক্ষেত্রে প্রায়ই ভুক্তভোগী বা ক্ষতিগ্রস্থ রোগীদের অভিযোগের প্রেক্ষিতে স্থানীয় মার্কেট মালিক পক্ষ বা মার্কেট ব্যবসায়ী সমিতি কিংবা ডেন্টাল ব্যবসায়ীরা একত্র হয়ে স্থানীয় লোকজনের সহায়তা নিয়ে বিচার বা ক্ষতিপূরণ দেয়ার নামে ক্ষতিগ্রস্থ রোগীদের বিভিন্ন প্রকার ভয়ভীতি হুমকি প্রদর্শন করে নামমাত্র জরিমানার টাকা দিয়ে সমস্যার সমাধান করেন বলেও স্থানীয় ভূক্তভোগী ক্ষতিগ্রস্থদের অভিযোগের অন্ত নেই। অনেক ক্ষেত্রে ভূক্তভোগী বা ক্ষতিগ্রস্থ রোগীরা ওসব প্রতারক ও ভূয়া নামধারী ডেন্টাল ক্লিনিকের ডাক্তারদের আইনের আওতায় আনতে বা সুষ্ট বিচার পেতে স্থানীয় প্রশাসনে অভিযোগ করলেও-পাচ্ছে না নিরপেক্ষ সূষ্ট তদন্ত বা সঠিক বিচার কিংবা ক্ষতিপূরণ! উপরোন্ত সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের লোকজন এসব বিষয়ে সূর্নিদিষ্ঠ অভিযোগ পাওয়ার পরও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহন না করে, উল্টো স্থানীয় মার্কেট মালিকপক্ষ বা মার্কেট ব্যবসায়ী সমিতি কিংবা ডেন্টাল ব্যবসায়ীসহ স্থানীয় লোকজনকে সঙ্গী করে অভিযোগকারীর বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে নির্বিগ্নে করছে হয়রানী। মিমাংশার নামে অভিযুক্ত ওই ভূয়া ডেন্টাল ডাক্তারকে নামমাত্র জরিমানা করে বিষয়টি ধামাচাপা দেয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে কোন কোন ভূক্তভোগী ক্ষতিগ্রস্থ রোগী বা তার পরিবার পরিজনের। জেলা পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন আইন প্রয়োগকারী সংস্থা বা স্বাস্থ্যসেবা অধিদপ্তর কিংবা বাংলাদেশ ডেন্টাল এ্যাসোসিয়েশন (বিডিএস) কর্তৃক ডেন্টাল চেম্বার বা চেম্বারে বসা ডেন্টাল ডাক্তারদের অভিজ্ঞতা সনদসহ সরকারীভাবে অনুমোদনের সূনিদিষ্ট তালিকা রয়েছে। তালিকা বর্হিভূত চেম্বার বা নামসর্বস্ব অনভিজ্ঞ অশিক্ষিত ভূয়া ডাক্তার বা সরকারী অনুমোদন বিহীন চেম্বারগুলো নিয়ন্ত্রনের দায়িত্বও রয়েছে স্বাস্থ্যসেবা অধিদপ্তর কিংবা বাংলাদেশ ডেন্টাল এ্যাসোসিয়েশন (বিডিএস) কর্তৃপক্ষ কিংবা আইন প্রয়োগ সংস্থাগুলোর। অথচ সংশ্লিষ্ট সরকারী সংস্থাগুলো তাদের তদারকি করাতো দুরের কথা সরকারী অনুমোদন বিহীন টঙ্গীর ষ্টেশন রোডসহ বিভিন্ন এলাকায় ব্যাঙ্গের ছাতার মতো গজিঁয়ে উঠা ভূয়া অশিক্ষিত নামধারী ডেন্টাল ডাক্তারদের চেম্বার বা ক্লিনিক বসিয়ে দাঁতের সমস্যায় আক্রান্ত এবং দুর-দুরান্ত থেকে আসা দাঁতের রোগীদের ভূল চিকিৎসা প্রদান এবং দাঁতের চিকিৎসা করতে গিয়ে মানুষের অঙ্গহানীকারী প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট সরকারী সংস্থাগুলো রহস্যজনক কারণে কোন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করছে না বা করেও না কখনো। ফলে দাঁতের রোগে আক্রান্ত হয়ে এসব নামসর্বস্ব ডেন্টাল চেম্বার বা ক্লিনিক এবং অনভিজ্ঞ অশিক্ষিত ভূয়া ডেন্টাল ডাক্তার দ্বারা ভূল চিকিৎসা প্রদান করার কারণে শারীরিক, মানুষিক ও অর্থনৈতিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে এ অঞ্চলের শিশু-কিশোর থেকে বয়োবৃদ্ধ নারী-পুরুষ এবং দরিদ্র-মধ্যবিত্তসহ সব শ্রেনীর মানুষ। একটি বিশেষ সূত্রে জানা যায়, টঙ্গীর ষ্টেশন রোড এলাকার আধুনিক ডেন্টাল ক্লিনিক এর মালিক যিনি নিজেকে একজন অভিজ্ঞ ডেন্টাল ডাক্তার হিসেবে পরিচয় দিয়ে থাকেন। তিনি নিজেকে দাঁতের অভিজ্ঞ ডাক্তার পরিচয় দিলেও, অভাবের তাড়নায় তিনি এক সময় নেত্রকোণা জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের অজ পাড়া গাঁ থেকে কাজের সন্ধানে টঙ্গীতে এসে এক আত্বীয়ার মাধ্যমে ষ্টেশন রোডের একটি ডেন্টাল ক্লিনিকে কাজ নেন একজন সাধারণ কর্মচারী হিসেবে। শিক্ষাগত যোগ্যতা তেমন না থাকলেও আজ তিনি দাঁতের অভিজ্ঞ একজন ডাক্তার হিসেবে পরিচয় দিয়ে থাকেন সর্ব মহলে। টঙ্গী ষ্টেশন রোডের আল-আমিন বেকারীর পূর্ব পাশে একটি টিনের চাফরা রুম ভাড়া নিয়ে সরকারী ডিগ্রি বা কোন অনুমোদন না থাকলেও আধুনিক ডেন্টাল ক্লিনিক নামে ডেন্টাল ক্লিনিক বসিয়ে প্রতিনিয়ত দাঁতের রোগে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা সেবা প্রদানের নামে প্রায়ই ভূল চিকিৎসা দিয়ে হাতিয়ে নিচ্ছেন মোটা অংকের অর্থ। সেই সাথে রোগীদের সাথে প্রতারণা করছেন অনেকটাই খোলা মেলা ভাবে। তার ভূল চিকিৎসায় আক্রান্ত হয়ে কেউ ক্ষতিগ্রস্থ হলে তাকে বিভিন্ন ভাবে হয়রানীসহ প্রাণনাশের হুমকি দিতেও দ্বিধা করছেন না ওই নামধারী দাঁতের চিকিৎসক। জানা যায়, গত পৌষ মাসে দাঁতের ব্যথা নিয়ে নামসর্বস্ব ডাক্তার হুমায়ুন কবীরের কাছে আসা লাদেন নামে এক রিকশা চালক ভূল চিকিৎসায় দুটি দাঁত হারিয়ে মারাত্তক অসুস্থ হয়ে পড়েন। এছাড়া ওই ডাক্তার সাহেব রোগীর দাঁত দুটি তুলে ফেলার পর ভূল ঔষধ ব্যবহার করে পাশের আরো কয়েটি দাঁত নষ্ট করে দেন। বিষয়টি বুঝতে পেরে, ওই রোগী বিষয়টি স্থানীয় থানা পুলিশকে মৌখিক ভাবে জানান। থানায় লিখিত কোন অভিযোগ না করায় ঘটনাটি জানতে থানার একজন এসআইকে দায়িত্ব দেন থানার অফিসার্স ইনচার্জ। ওই এসআই ঘটনাটি জানার পর, মার্কেটের মালিক এবং ব্যবসায়ী সমিতির লোকজনসহ স্থানীয় লোকজনকে বিষয়টি সুরাহা করার দায়িত্ব দেন। অসুস্থ রিকশা চালক লাদেন থানায় দীর্ঘ কয়েক মাস ঘুরাঘুরি করার পরও বিষয়টি কেউ-ই সমাধান করেননি। ইতিমধ্যে ওই এসআই থানা থেকে বদলী হয়ে অন্যত্র চলে যান। পরবর্তীতে, থানা পুলিশের কাছে বিচার চাওয়ায় অসুস্থ লাদেনের প্রতি ক্ষীপ্ত হন ভূয়া ডাক্তার হুমায়ুন কবীর। এমতাবস্থায় অসুস্থ লাদেন আরো অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে তিনি দাঁতের চিকিৎসা করাতে একই এলাকার মুক্তা ডেন্টালে যান। ওই প্রতিষ্ঠানের মালিক মনিরুজ্জামান নিজেকে ডেন্টাল ডাক্তার পরিচয় দিয়ে থাকেন। অথচ তার বিরুদ্ধেও রয়েছে একাধিকবার ভূল চিকিৎসা করে স্থানীয় ভাবে জরিমানা প্রদানের অভিযোগ। এবার এই খ্যাতিমান দাঁতের ডাক্তার মনিরুজ্জামান হিসেবে নিজেই রিকশা চালক দরিদ্র লাদেনের দাঁত দেখে ফিলিং করার প্রস্তাব দেন। দাঁত ফিলিং করার সময় সেখানে হাজির হন ভূয়া ডাক্তার হুমায়ুন কবির বলে জানান ভূক্তভোগী লাদেন। ভূক্তভোগী লাদেন আরো জানান, হুমায়ুন কবীর এসে মনিরুজ্জামানকে বাইরে ডেকে নিয়ে কানে কানে কিছু বলার পর ডাক্তার মনিরুজ্জামান সাথে করে অজ্ঞাত নামা আরো দু- ব্যক্তি নিয়ে আমার কাছে আসেন। পরে তারা তিনজন মিলে আমার দাঁত ফিলিং করার কথা বলে, দাঁত কাঁটার যন্ত্র দিয়ে আমার চাপার দু-পাশের দাঁত জোর পূর্বক কাঁটতে থাকে। আমি বাঁধা দিলে তারা আমার দু-হাত চেপে ধরে। পরে আমি আমার জীবন ও দাঁতগুলোকে বাঁচাতে পাড়াপাড়ি করে চলে আসি এবং তাৎক্ষনিক থানায় এসে লিখিত অভিযোগ দেই। থানায় অভিযোগ দেয়ার পর থানার একজন এস আইকে বিষয়টির তদন্তভার দেয়া হয়। তদন্তকারী অফিসার বিষয়টি তদন্ত না করে, আমাকেসহ দুই ডাক্তারকে থানায় ডেকে নিয়ে উভয়ের মধ্যে বিষয়টি আপোষের চেষ্টা করেন। আমি আপোষে রাজি না হওয়ায়, ভূয়া ডাক্তার হুমায়ুন কবীর থানার সামনে প্রকাশ্যে আমাকে হত্যার হুমকি দিয়ে বলেন, বেশী বাড়াবাড়ি করলে তোর মতো রিকশা চালককে ২০ লাখ টাকা খরচ করে বাঁলিশ ছাড়া শুয়ে দিবো। তারপর দেখি তুই কি করিস। আমি দরিদ্র একজন রিকশা চালক, এখানে আমার কেউ নেই। হুমায়ন এবং মনিরুজ্জামানের পক্ষে মার্কেট ব্যবসায়ীসহ অনেকেই আছে। আমি এখন আতংকে আছি। আমি এঘটনার সুষ্ট বিচার চাই। পরবর্তীতে বিষয়টি স্থানীয় ভাবে জানাজানি হয়ে পড়লে, নামধারী ডেন্টাল ডাক্তার হুমায়ুন কবীর ও মনিরুজ্জামান মিলে মার্কেট ব্যবসায়ী ও স্থানীয় লোকজনসহ তাদের আত্বীয় স্বজন নিয়ে লাদেনের সাথে আপোষের জন্য মরিয়া হয়ে উঠে। এক পর্যায়ে থানার অফিসার্স ইনচার্জ বিষয়টি জানতে পেরে, থানার সিনিয়র একজন সিনিয়র এসআইকে বিষয়টি দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ার জন্য নির্দেশ দেন। পরে ওই অফিসার তদন্তের স্বার্থে বিষয়টির বিস্তারিত জানার উদ্দেশ্যে, গত ১০ মে সন্ধ্যায় দুই ভূয়া ডাক্তার ও বাদীকে থানায় ডাকেন। থানায় গিয়ে দুই ডাক্তার ও তাদের পক্ষে আসা মার্কেটের ব্যবসায়ীসহ স্থানীয় বেশ কিছু লোকজন লাদেনের সাথে বৈঠক করে আপোষ মিমাংশার প্রস্তাব দেন। এতে ক্ষতিগ্রস্থ রিকশা চালক লাদেন রাজি হলে, আধুনিক ও মুক্তা ডেন্টালের মালিক হুমায়ুন কবীর ও মনিরুজ্জামানকে ভূল চিকিৎসায় লাদেনের অঙ্গহানীর মতো মারাত্বক ক্ষতি করার অভিযোগে নগদ ৫ হাজার টাকা জরিমানা করেন এবং ক্ষতিগ্রস্থ লাদেনকে দুই দাঁতের ক্ষতিপূরণ এবং অন্যান্য দাঁতের চিকিৎসাবাবদ ৫ হাজার টাকা বুঝিয়ে দিয়ে বিষয়টির আপোষ মিমাংশা করেন স্থানীয় কতিপয় লোকজন। পরে আপোষ মিমাংশাকারীরা আপোষনামার কপি থানায় জমা দেন বলে ভূক্তভোগী লাদেনসহ স্থানীয় বিভিন্ন সূত্র জানান। এব্যাপারে স্থানীয় ব্যবসায়ী হাজী বাবুল জানান, আমরা মার্কেটের ব্যবসায়ী হিসেবে তাদের সহযোগীতা করে বিষয়টি আপোষ মিমাংশা করে দিয়েছি। ওরা গরীব মানুষ, তাদের কোন ক্ষতি হোক এটা আমাদের কারো কাম্য নয়। ভবিষ্যতে এমন হলে আর যাবো না। ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে থানার সিনিয়র এস আই আশিকুর রহমান রোলান্ড জানান, ক্ষতিগ্রস্থ ব্যক্তি দরিদ্র একজন রিকশা চালক। স্থানীয় কয়েকজন ব্যবসায়ী ও লোকজন মিলে বাদী-বিবাদী উভয় পক্ষের মধ্যে বিষয়টি আপোষ করে-আপোষনামার কপি থানায় জমা দিয়েছেন।

মৃণাল চৌধুরী সৈকত,সিনি:স্টাফ রিপোর্টার

0 Shares
  • 0 Facebook
  • Twitter
  • LinkedIn
  • Mix
  • Email
  • Print
  • Copy Link
  • More Networks
Copy link
Powered by Social Snap