টঙ্গীতে আবাসিক এলাকা থেকে কেমিক্যাল গোডাউন সরিয়ে নেয়ার দাবী

tongi

এবার অল্পের জন্য বেঁচে গেলো হাজারো মানুষের প্রাণ। রাজধানী ঢাকার নিমতলী কেমিক্যাল গোডাউনের ন্যায় টঙ্গীর উত্তর আরিচপুর হাফিজ উদ্দিন বেপারী রোড ও সমবায় বিপনীসহ আশপাশের আবাসিক এলাকায় গড়ে উঠা কেমিক্যাল মার্কেট ও গোডাউনগুলো এলাকাবাসীর জন্য এক আতংকের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্থানীয় লোকজনের দাবী, রাজধানী ঢাকার নিমতলীতে কেমিক্যাল গোডাউনে ভয়াবহ অগ্নিকান্ডে বিপুল পরিমান মানব-সম্পদ হতাহত ও ক্ষতিগ্রস্থের পর এবার টঙ্গী ঘটতে যাচ্ছিল একই ঘটনা। স্থানীয় বাসিন্দারা বারবার ওইসব গোডাউন বা মার্কেট জনবহুল এলাকা থেকে সরিয়ে নিতে প্রশাসনের দ্বারস্থ হলেও কোন ফল পায়নি এমন অভিযোগ রয়েছে খোদ মার্কেট মালিক পক্ষ।

মালিক পক্ষ বলছে, মার্কেট ভাড়ার চুক্তি অনুযায়ী ব্যবসায়ীরা ব্যবসা করছে না বরং সরকারী বা স্থানীয় সিটি কর্পোরেশনের অনুমতিহীন এমন কি কোন প্রকার প্রশিক্ষণ ছাড়াই অত্যন্ত ঝুকিপূর্ণ অবস্থায় আবাসিক এলাকাসহ স্থানীয় সমবায় কমপ্লেক্স মার্কেটের নীচতলায় প্রায় শতাধিক কেমিক্যাল ব্যবসায়ীরা তাদের ব্যবসা পরিচালনা করছে। এদের মধ্যে রাজধানী ঢাকার শীর্ষ স্থানীয় ২/৪ জন এক্সপোর্ট ব্যবসায়ীও রয়েছে।

আবাসিক এলাকার বাসিন্দারা জানান, টঙ্গী গাজীবাড়ি ও হাফিজ উদ্দিন বেপারী রোডে বা উত্তর আরিচপুর সমবায় কমপ্লেক্সের আশেপাশ এলাকায় প্রায় লক্ষাধিক মানুষে বসবাস। তথাপিও এসব কেমিক্যাল বা ড্রাম ব্যবসায়ীরা অত্র এলাকায় তাদের শতাধিক ঝুঁকিপূর্ণ গোডাউন বা দোকান ভাড়া নিয়ে এবং কেমিক্যাল মজুদ রেখে ড্রাম ও কেমিক্যালের ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে অনায়াসে।
গত সোমবার দুপুরে স্থানীয় হাফিজ উদ্দিন ব্যপারী রোডের একটি কেমিক্যাল মার্কেটে বৈদ্যুতিক শর্ট-সার্কিট থেকে বিকট শব্দে আগুনের সূত্রপাত হয়। আগুনের একটি স্ফুলিঙ্গ স্থানীয় বাসিন্দা সুমনের ভাড়া দেয়া টিনসেটে ব্যবসায়ী বখতিয়ারের মিতালী কেমিক্যাল গোডাউনের উপর পড়লে ভয়াবহ আগুনের সৃষ্টি হয় এবং মূহুর্তের মধ্যে আগুন ওই গোডাউনসহ অপর ২টি গোডাউনে ছড়িয়ে পড়ে। এতে এলাকায় ব্যাপক আতংকের সৃষ্টি হয় এবং এলাকার নারী-পুরুষ, বৃদ্ধ-বর্ণিতা, শিশু-কিশোর মূহুর্তের মধ্যে যার যার বাসা বাড়ি তালাবদ্ধ করে রাস্তায় নেমে আসে।
জানা যায়, অগ্নিকান্ডে ক্ষতিগ্রস্থ উক্ত কেমিক্যাল ও ড্রামের গোডাউনের পাশেই ছিলো কেমিক্যাল এক্সপোর্ট ব্যবসায়ী জলিলের আল-মদিনা নামে আরেকটি গোডাউন। যেখানে বিপুল পরিমান ধার্য-পদার্থ মজুদকৃত ছিলো। স্থানীয় লোকজন এবং ফায়ার সার্ভিসের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় আল-মদিনা অল্পের জন্য রক্ষা পায়, ভয়াবহ অগ্নিকান্ডের হাত থেকে রক্ষা পায় এলাকাবাসী।

এছাড়াও সমবায় বিপনীর নীচতলায় কেমিক্যাল মার্কেট, বয়লার ও দ্বিতীয় তলায় ব্যবসায়ীদের অফিস ও মসজিদ এবং তৃতীয় তলায় সাঙ্গু গার্মেন্টস লিঃ যেখানে ৭শ শ্রমিকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে প্রায় আরো ৩শ শ্রমিক কর্মচারী কাজ করে প্রতিদিন এবং দক্ষিনে ও পশ্চিমে দেয়াল ঘেঁষে আবাসিক বাসা-বাড়ি রয়েছে।

ওইসব বাসা-বাড়িতে কেমিক্যাল ব্যবসায়ী রিপনের ফারিয়া ট্রেডাস, আল-আমিনের মা এন্টারপ্রাইজ, বখতিয়ারের ও বাবুর ক্যামিক্যাল গোডাউন রয়েছে। এছাড়াও সমবায় কমপ্লেক্সের নীচতলায় কেমিক্যাল ব্যবসায়ী সিরাজের আই এম কেমিক্যাল, কেমিক্যাল এক্সপোর্ট ব্যবসায়ী জাফরের পদ্ধা কেমিক্যাল লিঃ, ইউনুছের সাফিয়া কেমিক্যাল, ইলিয়াসের শান্তা কেমিক্যাল. ফিরোজ মিয়ার ফিরোজ কেমিক্যাল, শামীমের যমুনা কেমিক্যাল, এনামুলের রুপসা কেমিক্যাল, রাসেলের রাজিব এন্টারপ্রাইজ, শাহাবুদ্দিনের এস এস এন্টারপ্রাইজ, নজরুলের সেভেন স্টার, জলিলের অঅল-মদিনা, রিপনের ফারিয়া ট্রেডাস, আল-আমিনের মা এন্টারপ্রাইজসহ প্রায় ৫০ টির অধিক কেমিক্যাল শো-রুম ও গোডাউন রয়েছে।
অপরদিকে তিতাস গ্যাস রোড ও হাফিজ উদ্দিন বেপারী রোডে জলিল, বখতিয়া, আল-আমিনের কেমিক্যাল গোডাউনসহ শফিকুল ও ইউনূছ মিয়ার কেমিক্যালের দোকানসহ স্থানীয় সড়ক মহা-সড়ক দখল করে ফিরোজ, নবী হোসেন, জানু মিয়া, হানিফ, কবীর, দাউদ, সেলিম, রিপন, মলিন মিয়া, আলম, নুরু মিয়া, রহিম, নারায়ন বাবুর ড্রামের একাধিক দোকান ও গোডাউন রয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবী, অবিলম্বে এসব কেমিক্যাল বা ড্রামের দোকান এবং গোডাউন সমবায় বিপনী মার্কেটসহ এসব আবাসিক এলাকা থেকে সরিয়ে দেয়া জরুরী। নয়তো রাজধানী ঢাকার নিমতলী কেমিক্যাল গোডাউনে ভয়াবহ অগ্নিকান্ডের ন্যায় ভয়াবহ পরিস্থিতির শিকার হতে হবে টঙ্গীবাসী।
এবিষয়ে সমবায় কমপ্লেক্স মার্কেটের সামনে গতকাল বৃহস্পতিবার বিকালে টঙ্গী থানা পুলিশের পক্ষ থেকে বিট পুলিশিং সভা করেছে। সভায় ৫৬নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর আবুল হোসেন, টঙ্গী পূর্ব থানার অফির্সাস ইনচার্জ (ওসি) মুহাম্মদ আমিনুল ইসলাম, মার্কেট মালিক মো. শাফায়েত হোসেন, কেমিক্যাল ব্যবসায়ী সিরাজুল ইসলাম, স্থানীয় বাসিন্দা আমির হোসেন আমু, মোহাম্মদ আলী ভূঁইয়া বক্তব্য রাখেন। বক্তারা অবিলম্বে ওই এলাকা থেকে বিপজ্জনক কেমিক্যাল গোডাউন সরিয়ে নেওয়ার জোর দাবী জানান।
মার্কেট মালিক সাফায়েত হোসেন বলেন, সরকারী অনুমোদন বিহীন অবৈধ এই ব্যবসা এ মার্কেটে করতে দেয়া হবে না। বার বার প্রশাসনসহ বিভিন্ন স্থানে এসব ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেও কোন সমাধান পাওয়া যায়নি। প্রয়োজনে মার্কেটে হাঁস, মুরগী ও গরুর ব্যবসা করা হবে।

আরও পড়ুনঃ টঙ্গীতে চাকুরীর প্রলোভনে কোটি টাকা আত্মসাৎ, ৫ প্রতারককে গনধোলাই দিয়ে পুলিশে সোপর্দ

কাউন্সিলর আবুল হোসেন তার বক্তব্যে বলেন, ঝুকিপূর্ণ অবস্থায় ব্যবসা না করে সরকারী নির্দেশনা মোতাবেক ব্যবসা করুন, এলাকাবাসীর ক্ষতি করবেন না। সমবায় কমপ্লেক্স এর নীচতলায় বয়লার, কেমিক্যাল দোকান বা গোডাউন, দোতালায় অফিস, তিন তলায় গার্মেন্টস যেখানে ৭শ শ্রমিক কাজ করে, তাদের নিরাপত্তার কথা ভেবে আপনারা ব্যবসায়ীরা মানবিক কারণে মার্কেটসহ আশপাশের গোডাউন সরিয়ে নেয়ার আহবান জানাচ্ছি।

টঙ্গী পূর্ব থানার অফিসার্স ইনচার্জ মুহাম্মদ আমিনুল ইসলাম তার বক্তব্যে বলেন, আমি আসার পর কেউ কখনো এসব ব্যপারে কোন অভিযোগ করেনি। এধরনের ভয়াবহ ঝুকিপূর্ণ ধার্যপদার্থের ব্যবসা বা গোডাউন আবাসিক এলাকা থেকে সরিয়ে নিতে হবে। এব্যাপারে কাউকে ছাড় দেয়া হবে না। তাছাড়া যাঁরা ব্যবসা করবেন, তারা দয়া করে এ ব্যবসা পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষন নিবেন। আশপাশের সাধারণ জনগণের জানমাল, আপনার ও আপনার শ্রমিকের জীবন বিপন্ন হয় এমন কাজ কেউ করবেন না।

মৃণাল চৌধুরী সৈক, টঙ্গী