গোপনে কালী সাধনাও করতেন পাপিয়া

Papia used to secretly pursue Kali

সদ্য বহিষ্কৃত যুব মহিলা লীগ নেত্রী শামীমা নূর পাপিয়া ওরফে পিউসহ গ্রেফতার ৪ জনকে তিন মামলায় ৫ দিন করে ১৫ দিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ।

তবে এরই মধ্যে জিজ্ঞাসাবাদে পাপিয়া ওরফে পিউদের মুখ থেকে বেরিয়ে আসছে অনেক পিলে চমকানো তথ্য। বেরিয়ে আসছে অনেকের নাম। তদন্তে উঠে আসছে, অনেক প্রভাবশালীর সঙ্গে পিউর বিশেষ সম্পর্ক এবং ব্যবসার বিষয়টিও।

ইতিমধ্যে র‌্যাব পিউর ঢাকার বাসা, অফিস এবং নরসিংদীর বাড়ি থেকে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ আলামত সংগ্রহ করেছে। এর কিছু তথ্য ইতিমধ্যে বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রকাশিত হয়েছে।

একাধিক সূত্র বলছে, পাপিয়াকে নিয়ে অনেক রাজনৈতিক নেতার ঘুম হারাম হয়ে গেছে। কারণ, পাপিয়াকে কারা আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়েছেন, কারা বিভিন্ন কমিটিতে বড় পদ পাইয়ে দিতে ভূমিকা রেখেছেন এবং কারা পাপিয়ার কাছ থেকে সুবিধা নিয়েছেন এর সব তথ্য এখন আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার হাতে।

কীভাবে পাপিয়ার উত্থান হয়েছে সে বিষয়টি নিয়েও তদন্ত চলছে। তবে এরই মধ্যে পাপিয়া অনেক প্রভাবশালী রাজনীতিবিদের নাম বলেছেন বলে সূত্র নিশ্চিত করেছে।

জাল টাকা সরবরাহ, মাদক ব্যবসা, অনৈতিক কাজ, অবৈধ অস্ত্র ও মাদক রাখার অভিযোগে পাপিয়া ও তার স্বামী মফিজুর রহমান সুমন ওরফে মতি সুমনকে তিন মামলায় মোট ১৫ দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেছে আদালত।

এ ছাড়া অপর দুই আসামি সাব্বির খন্দকার ও শেখ তায়্যিবাকে বিমানবন্দর থানার মামলায় পাঁচ দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করে আদালত। বিমানবন্দর থানায় দায়ের করা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মো. কায়কোবাদ কাজী গতকাল আসামিদের আদালতে হাজির করেন।

একই সঙ্গে সুষ্ঠু তদন্তের জন্য আসামিদের প্রত্যেকের ১০ দিন করে রিমান্ড আবেদন করেন। র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লে. কর্নেল সারওয়ার বিন কাশেম  বলেন, মামলার তদন্ত নিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছে র‌্যাব।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদেই আমরা বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছি। তবে আমাদের বিশ্বাস রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদে আরও অনেক তথ্য পাওয়া যাবে।

তিনি আরও বলেন, পাপিয়ার উত্থানের পিছনে কাদের ভূমিকা ছিল- কারা পাপিয়া গংদের কাছ থেকে নিয়মিত সুবিধা নিতেন তাদের প্রত্যেকের বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে।

আমরা প্রত্যেকটি তথ্যকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিচ্ছি। সে যেই হোক না কেন তাকে আইনের আওতায় নেওয়া হবে।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, পাপিয়া মুসলিম ধর্মের অনুসারী হলেও তার নিয়মিত যাতায়াত ছিল কালী মন্দিরে। এর বাইরেও তিনি শিব লিঙ্গের পূজা করতেন।

গ্রেফতারের পর দেখা যায়, পাপিয়ার এক হাতে কাবার ছবি, অন্য হাতে মন্দিরের ছবি আঁকা রয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে রাজনীতিতে উত্থানের নিয়ামক হিসেবে দুজন প্রভাবশালী নেত্রীর নাম বলেছেন পাপিয়া।

পরবর্তীতে তারাও নিয়মিতভাবে পাপিয়ার কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা নিয়েছেন। তাদের একজন তার ব্যবসায়িক পার্টনারও। প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কাছ থেকে বিভিন্ন সুবিধা আদায়ের জন্য সুন্দরী তরুণী সরবরাহ করতে পাপিয়ার সহায়তা চাইতেন অনেকে।

সেখানেই ওই প্রভাবশালীদের অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ছবি ধারণ করে রাখতেন তিনি। পরবর্তীতে তাদের নিয়মিতভাবে ব্ল্যাকমেইলিং করতেন তিনি।

আরও পড়ুনঃ প্রেমের ফাঁদে ফেলে স্কুলছাত্রীকে একাধিক বার ধর্ষণ

পাঁচ বছরে ফুলেফেঁপে উঠেছে পাপিয়ার সম্পদ : পাপিয়া একটি অটো গ্যারেজের মালিক সাইফুল বারীর মেয়ে। এর আগে তিনি পেট্রোবাংলার গাড়িচালক ছিলেন।

অন্যদিকে, তার স্বামী মতি সুমনের বাবা মতিউর রহমান চৌধুরী একজন গানের শিক্ষক। আধাপাকা টিনশেড ঘরেই কেটেছে তাদের দুজনের শৈশব-যৌবন।

২০১১ সালে মতি সুমনের সঙ্গে বিয়ের সময়ও তাদের কিছুই ছিল না। ২০১৪ সাল পর্যন্ত অনেকটা একই অবস্থা ছিল তাদের। এই দম্পতির মাদহাত চৌধুরী ইসাব নামে আট বছরের একটি ছেলে রয়েছে। তবে গত পাঁচ বছরে অর্থ বিত্তে ফুলেফেঁপে উঠেছেন।

গাড়ি, বাড়ি, ফ্ল্যাট কিনে বনেছেন শত কোটি টাকার মালিক। দেশে গাড়ির ব্যবসার পাশাপাশি বিদেশে দিয়েছেন বার। আর সবই করেছেন, অন্যায় ও অপকর্মের ওপর ভর করে। ধনাঢ্য ব্যবসায়ীদের ব্ল্যাকমেইল, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা ও দেহ ব্যবসাই তাদের মূল পেশা।

অতি সস্প্রতি পাপিয়া দোতলা আধুনিক একটি বাড়ি করেছেন। ২০০০ সালের দিকে নরসিংদী শহর ছাত্রলীগের সাবেক আহ্বায়ক মতি সুমনের উত্থান। শৈশব থেকেই চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী কর্মকান্ড ও ব্ল্যাকমেইল ছিল সুমনের প্রধান পেশা।

২০০১ সালে পৌরসভার কমিশনার মানিক মিয়াকে যাত্রা প্যান্ডেলে গিয়ে হত্যার পর তিনি আলোচনায় আসেন। ২০১২ সালের অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে নরসিংদী শহরের বাসাইল এলাকায় নিজ বাসার সামনে সুমনের ওপর গুলি চালায় সন্ত্রাসীরা। এ সময় সন্ত্রাসীদের ছোড়া গুলিটি বিদ্ধ হয় তার স্ত্রী পাপিয়ার পেটে।

এরপর তারা নরসিংদী ছেড়ে ঢাকায় পাড়ি জমান। ঢাকায় যুব মহিলা লীগের এক নেত্রীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলেন। ওই নেত্রীর মাধ্যমেই বিস্তৃত হতে থাকে তার বলয়।

অনেকের সঙ্গেই ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে জড়ান পাপিয়া। গড়ে তোলেন এক বিশাল সিন্ডিকেট। বিভিন্ন প্রভাবশালী ও ধনাঢ্য ব্যক্তিদের ব্ল্যাকমেইল করে দুই হাত ভরে কামাতে থাকেন অর্থ।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যবসায়ী জানায়, ব্ল্যাকমেইলই তাদের প্রধান পেশা। তারা প্রথমে সুন্দরী নারীদের পাঠায়। তারপর কৌশলে ধনাঢ্য ব্যক্তিদের ছবি ভিডিও করে। পরে তাদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেয়।

নরসিংদী শহর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি শ্যামল কুমার সাহা বলেন, এত অল্প সময়ে কেউ বিপুল পরিমাণ অর্থ সম্পদের মালিক হতে পারে না। তারা অনৈতিক কাজ করেই এসব অর্জন করেছেন।

আর অসহায় ও দরিদ্র মেয়েদের চাকরি দেওয়ার কথা বলে তাদের দেহ ব্যবসা করতে বাধ্য করতেন। নইলে তাদের ওপর নির্যাতন চালানো হতো। নরসিংদী শ্রমিক লীগের আহ্বায়ক আবুল কালাম আজাদ বলেন, পাপিয়া ও তার স্বামীর চালচলন দেখে প্রথম থেকেই আমাদের সন্দেহ ছিল।

তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যও সন্দেহের বাইরে ছিল না। তার আয়ের উৎস সম্পর্কে সব সময় ধোঁয়াশা ছিল। প্রসঙ্গত, গত শনিবার দুপুরে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে জাল টাকা বহন ও অবৈধ টাকা পাচারের অভিযোগে শামীমা নূর পাপিয়া ওরফে পিউসহ চারজনকে গ্রেফতার করে র‌্যাব।

পরদিন সকালে রাজধানীর ইন্দিরা রোডে পাপিয়ার বাসায় অভিযান চালিয়ে একটি বিদেশি পিস্তল, দুটি ম্যাগাজিন, ২০ রাউন্ড গুলি, পাঁচ বোতল বিদেশি মদ, ৫৮ লাখ ৪১ হাজার টাকা, পাঁচটি পাসপোর্ট, তিনটি চেক, বেশকিছু বিদেশি মুদ্রা ও বিভিন্ন ব্যাংকের ১০টি এটিএম কার্ড উদ্ধার করা হয়।

0 Shares
  • 0 Facebook
  • Twitter
  • LinkedIn
  • Mix
  • Email
  • Print
  • Copy Link
  • More Networks
Copy link
Powered by Social Snap