ক্ষুধামুক্ত স্বনির্ভর দেশের জন্য তারুণ্যশক্তি

Education Development Society

প্রতিবছর ১২ আগস্ট সারাবিশ্বের ন্যায় বাংলাদেশেও আন্তর্জাতিক যুব দিবস পালন করা হয়। কোভিড-১৯ এর কারণে গত বছরের ন্যায় এবারেও আয়োজনে হচ্ছে ব্যতিক্রমী, দিবস উদযাপনের পদ্ধতিতে এসেছে পরিবর্তন, আবার প্রযুক্তি ব্যবহারে ফলে এসেছে নতুন মাত্রা।

এ বছর আন্তর্জাতিক যুব দিবসের প্রতিপাদ্য হলো “ খাদ্য ব্যবস্থাপনার রুপান্তর, মানুষের জন্য যুব উদ্ভাবন”। যুবরাই শক্তি, তাদের হাত ধরেই অগ্রগতি। জাতিসংঘের টেকসই অভীষ্ট লক্ষ্যমাত্রার প্রথমটি হচ্ছে ক্ষুধামুক্তি।

যুবদের কর্মদক্ষতার ইতিবাচক ব্যবহারের মাধ্যমে ক্ষুদা ও দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ বিনির্মাণ করা সম্ভব।  যুবদের উদ্ভাবনী শক্তিকে কাজে লাগিয়ে খাদ্য ব্যবস্থাপনায় গতি সঞ্চার করাই এবারের যুব দিবসের লক্ষ্য। একটি দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে যুবদের অবদান অপরিসীম।

গত ২২ জুন খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার সচিবালয়ে ‘বাংলাদেশ দ্বিতীয় রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ পরিকল্পনা খসড়া মনিটরিং রিপোর্ট ২০২১ পর্যালোচনা ও অনুমোদন সংক্রান্ত সভায়’ পুষ্টিকর ও নিরাপদ খাদ্য মানুষের কাছে পৌছে দিতে সরকার খাদ্য ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করতে কাজ করছে বলে উল্লেখ করেছেন। যুবদের উদ্ভাবনী শক্তিকে কাজে লাগাতে পারলে সরকারের এ কার্যক্রম বেগবান হবে। বাংলাদেশে এখন ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড চলছে।

ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড হলো একটি দেশের জনসংখ্যার বয়স চিত্রের তারতম্য, এটি জন্মহার ও মৃত্যুহার হ্রাস-বৃদ্ধির কারণে ঘটে। এ ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড ১৫-৬৪ বছর বয়স পর্যন্ত কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা এবং কাজের জন্য শারীরিক ও মানসিকভাবে যোগ্য নন অর্থাৎ ১৪ বছরের নিচে এবং ৬৫ বছরের ঊর্ধ্বে এমন মানুষের সংখ্যার পার্থক্য বা ব্যবধান প্রকাশ করে।

অর্থাৎ, কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা যদি কর্মক্ষম নন এমন মানুষের সংখ্যার চেয়ে বেশি হয় তাহলে সেটি ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড হয়। বর্তমানে দেশে কর্মক্ষম মানুষ আছে ১০ কোটি ৫৬ লাখ যা মোট জনসংখ্যার ৬৬ শতাংশ। জনসংখ্যাতাত্ত্বিক এই পরিস্থিতি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য বড় সুযোগ এনে দিয়েছে।

জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) এশীয়-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের মানব উন্নয়ন প্রতিবেদনে বলা হয়, জনসংখ্যাতাত্ত্বিক এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে দেশকে এগিয়ে নিতে হলে আরও বেশি ও ভালো কাজের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে, শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে এবং উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ করতে হবে। ‘শেপিং দ্য ফিউচার: হাউ চেঞ্জিং ডেমোগ্রাফিকস ক্যান পাওয়ার হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট’ শীর্ষক প্রতিবেদনে ৪৫টি দেশের জনসংখ্যাভিত্তিক তথ্য, পরিবর্তনের ধরন এবং করণীয় সম্পর্কে বিশদ বর্ণনা করা হয়েছে। প্রতিবেদনটি বলছে, বাংলাদেশে ২০৩০ সালে কর্মক্ষম জনসংখ্যা বেড়ে দাঁড়াবে ১২ কোটি ৯৮ লাখে, যা মোট জনসংখ্যার ৭০ শতাংশ। দেশে বয়স্ক বা ৬০ বছরের বেশি বয়সী মানুষ প্রায় ৭ শতাংশ।

২০৩০ ও ২০৫০ সালে তা বেড়ে দাঁড়াবে যথাক্রমে ১২ ও ২২ শতাংশে। তাই এখনই সময় যুবশক্তিকে কাজে লাগিয়ে খাদ্য নিরাপত্তাসহ সকল মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা। গত ১০ বছরের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধারা পর্যালোচনা করলে এ কথা নিশ্চিত করেই বলা যায়, বাংলাদেশের অর্থনীতি এ মুহূর্তে প্রকৃত অর্থেই উন্নয়ন অগ্রযাত্রার এক বিশেষ পর্যায়ে রয়েছে।

ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড থেকে চারটি সুবিধা পাওয়া যায়। এগুলো হলো শ্রমের জোগানের উন্নতি, সঞ্চয়ের প্রবৃদ্ধি, মানবপুঁজি এবং দেশীয় বাজার সম্প্রসারণ। এ সুবিধাগুলো নিশ্চিত করতে কর্মক্ষম যুবশক্তিকে কাজে লাগানো হবে। ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড পিরিয়ড একটি দেশে সর্বোচ্চ ২০-৩০ বছর স্থায়ী হয়। অর্থাৎ, ২০৪০ সাল নাগাদ ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডকে কাজে লাগিয়ে দ্রুতগতিতে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের সুযোগটি হ্রাস পেতে শুরু করবে। এই সময়ের মধ্যেই তারুণ্যের হাত ধরে বাংলাদেশকে উন্নত দেশের কাতারে নিয়ে যেতে হবে।

খাদ্য ব্যবস্থাপনাকে  ভেজালমুক্ত ও পুষ্টিকর খাদ্য ভোক্তা যাতে পায় সেজন্যে ইতোপূর্বে নিরাপদ খাদ্য আইন ২০১৩ প্রণয়ন করা হয়েছে। এ আইনে বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতির যথাযথ অনুশীলনের মাধ্যমে নিরাপদ খাদ্য প্রাপ্তির অধিকার নিশ্চিতকরণে খাদ্য উৎপাদন, আমদানি, প্রক্রিয়াকরণ, মজুদ, সরবরাহ, বিপণন ও বিক্রয় সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম সমন্বয়ের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ এবং এলক্ষে একটি দক্ষ ও কার্যকর কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে।

এ আইন বাস্তবায়নে যুবদের অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। আমাদের জনসংখ্যার একটা বিশাল অংশ এখনো পুষ্টিহীনতায় ভুগছে। এর অন্যতম নিয়ামক সচেতনতার অভাব পুষ্টি সচেতনতা সৃষ্টি ও সবাই যেন পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করে সে জন্য এ ক্ষেত্রে তরুণদের সম্পৃক্ততা দরকার।

মোবাইল, ইন্টারনেটের মাধ্যমে তরুণদের পুষ্টি বিষয়ে ধারণা দেওয়া যেতে পারে। এ বিষয়ে তরুণ ও যুবসমাজকে উজ্জীবিত করা প্রয়োজন। ইতোপূর্বে অনেক তরুণ কৃষি উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে আত্মনির্ভরশীলতা অর্জনের পাশাপাশি মানসম্মত খাদ্য সরবারাহ করে চলছেন। এক্ষেত্রে উৎপাদন, বন্টণ,  বিপণন ব্যবস্থাপনায় সরকারের বিদ্যমান সহযোগিতা আরো বুদ্ধি করা আবশ্যক।

 

লেখকঃ ইনজামুল সাফিন

তরুণ সংগঠক

0 Shares
  • 0 Facebook
  • Twitter
  • LinkedIn
  • Mix
  • Email
  • Print
  • Copy Link
  • More Networks
Copy link
Powered by Social Snap