করোনার সুযোগ কাজে লাগিয়ে সুন্দরবনের বনজ সম্পদ লুট!

sarankhola bagerhat

বিশ্বের একক বৃহত্তর ম্যানগ্রোভ সুন্দরবন থেকে চলতি বছরের গোলপাতা আহরণ মৌসুম ইতিমধ্যে শেষ করেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। বনবিভাগের অনুমতি ক্রমে পাতা আহরন করে প্রথম ও দ্বীতিয় দফার চালান নিয়ে গভীর বন থেকে লোকালয়ে ফিরে এসেছেন সংশ্লিষ্টরা।

এখন সুন্দরবন হতে আহরিত গোলপাতা বিক্রিতে ব্যস্থ হয়ে উঠেছেন উপকুলীয় অঞ্চলের ব্যবসায়ীরা। তবে, চলতি বছর দেশ জুড়ে করোনা দুর্যোগ থাকায় বনবিভাগের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজশে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা তাদের নৌকা গুলোর দৈর্ঘ্য- প্রস্থ বাড়িয়ে তাতে বাড়তি অংশ যুক্ত করে (মলম) তৈরি করে সুন্দরববনের গোলপাতা আহরনের নামে নৌকার (তলদেশে) নিচের অংশে লুকিয়ে এবং নৌকার উভয় পার্শের ভারসম্য রক্ষার অজুহাতে ঝুলবেঁধে সুন্দরবনের কর্তন নিষিদ্ধ সুন্দরী, গেওয়া, গরান সহ নানা প্রজাতির হাজার হাজার মন গাছ লুটে নিয়েছে গোলপাতা ব্যবসায়ীরা।

নিয়ম অনুযায়ী কোন ধরনের বনজ সম্পদ আহরন সম্পুর্ন নিষিদ্ধ থাকলেও বাওয়ালীরা তা উপেক্ষা করলেও তাদের বিরুদ্ধে তেমন কোন পদক্ষেপ নিচ্ছেনা বনবিভাগ।

অভিযোগ রয়েছে , এ বছরের গোলপাতা আহরন কার্য়ক্রম তদারকির দ্ধায়িত্বে থাকা বনবিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তা কর্মচারীরা মোটা অংঙ্কের উৎকোচ নিয়ে ব্যবসায়ীদের নৌকা গুলোতে কোন প্রকার তল্লাশি না করে উল্টো সুন্দরবনে প্রবেশরত বাওয়ালীদের সহয়তা করেছেন।

তাছাড়া গোলপাতা আহরনের ক্ষেত্রে চলতি বছর কেবল মাত্র- পুর্ব- বনের চাঁদপাই রেঞ্জ হতে গোলপাতা সংগ্রহের জন্য ব্যবসায়ীদের অনুমতি দেওয়া হলেও নিয়ম নিতী উপেক্ষা করে শরনখোলা রেঞ্জের সহকারী বন-সংরক্ষক (এসিএফ) মো. জয়নাল আবেদীন ব্যাবসায়ীদের কাছ থেকে মোটা অংকের অনৈতিক সুবিধা গ্রহন করে পুর্ব-বনের অভায়রন্য এলাকা হিসেবে খ্যাত শরনখোলা রেঞ্জের-মরা ভোলা, ধাবড়ী , আড়াইবেকী ও টাকার খাল সহ বিভিন্ন এলাকা থেকে গোলপাতা আহরনের পাশাপাশি সুন্দরবন হতে নানা প্রজাতির শত শত মন গাছ সহ মুল্যবান বনজসম্পদ পাচার করে নেওয়ার সুযোগ করে দেন ব্যবসায়ীদের।

অনুসন্ধানে জানাগেছে, চলতি বছরের ২৮ জানুয়ারি প্রথম দফায় শুধু মাত্র সুন্দরবনের চাঁদ পাই রেঞ্জ হতে গোলপাতা আহরনের জন্য বাওয়ালীদের অনুমোদন দেয় বনবিভাগ।

মোট ৫৫টি কুপের অনুকুলে পশ্চিম বিভাগের সাতক্ষীরা, আড়ুয়া ও শিবসা এবং পূর্বের চাঁদপাই রেঞ্জের কয়েকটি এলাকা। তবে, চলতি বছরের গোলপাতা আহরন নিয়ে আলাপ হলে শরনখোলা উপজেলার দক্ষিন রাজাপুর এলাকার বাসিন্দা গোলপাতা ব্যবসায়ী ও আওয়ামীলীগ নেতা আফজাল হোসেন চাপরাশি বলেন, সম্প্রতি গোলপাতা আহরন মৌসুম শেষ হয়েছে কিন্তু সুন্দরবনের শরনখোলা রেঞ্জে এ বছর পাতা আহরনের কোন অনুমতি দেওয়া হয়নি।

কিন্তু তার পরেও সংশ্লিষ্ট (এসিএফ) সাহেব অনৈতিক সুবিধা নিয়ে অনেক ব্যাবসায়ীদের শরনখোলা রেঞ্জের বিভিন্ন নিষিদ্ধ এলাকা হতে গোলপাতা কাটার সুযোগ দেন।

এ সুযোগে বাওয়ালীরা নানা প্রজাতির শত শত মন গাছ কর্তন করে নেয় এবং নৌকা গুলো জঙ্গল হতে বেরিয়ে আসার সময় বনরক্ষীরা তেমন চেক না করায় সবাই সাধসন্ধ্যে জঙ্গল হতে নিজ নিজ এলাকায় ফিরে এসেছেন।

অপরদিকে, নাম গোপন রাখার শর্তে , সুন্দরবন সহ ব্যবস্থাপনা সংগঠন (সিএমসির) বন সংলগ্ন শরনখোলা এলাকার এক সদস্য বলেন, শরনখোলা রেঞ্জের (এসিএফ) জয়নাল স্যার যোগদান করার পর থেকে নানা অনিয়মে নিমোজ্জিত হয়ে পড়েন, বন সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দা চান্দু , ইউছুপ ও আলম ও অসাদুল মাতুব্বর সহ তার পছন্দের কতিপয় লোককে ব্যাবহার করে সুন্দরবনে নানা অপরাধ করতে উৎসাহ যোগান।

চলতি বছরে শরনখোলা রেঞ্জে গোলপাতার পাস না হলে তিনি মোটা অংকের ঘুষ নিয়ে ব্যাবসায়ীদের বনের বিভিন্ন এলাকা থেকে গোলপাতা সহ নানা প্রজাতির গাছ কর্তনের সুযোগ করে দেন।

এছাড়া ব্যবসায়ীরা নানা অনিয়ম করে গোলপাতা আহরনের অন্তরালে বনের বিভিন্ন প্রজাতির গাছ নিয়ে বোঝাই নৌকা গুলো (এসিএফের) নাকের ডগা থেকে বেরিয়ে গেলেও তিনি নৌকা গুলো তেমন তদারকি করেননি।

নানা অনিয়ম খতিয়ে দেখার জন্য (এসিএফ) জয়নাল আবেদীনের দ্ধায়িত্ব থাকলেও রহস্য জনক কারনে তিনি ও বগী ষ্টেশন কর্মকর্তা এ ক্ষেত্রে নিশ্চুপ ছিলেন। এছাড়া বনরক্ষীদের কেউ নৌকা তল্লাশী করতে চাইলেও তিনি তাদের ধমক দিয়ে থামিয়ে দেন।

সুন্দরবন সহ ব্যবস্থাপনা সংগঠন (সিএমসির) শরনখোলা শাখার সহ সভাপতি ও উপজেলা কৃষকলীগ নেতা এম ওয়াদুদ আকন বলেন, নানা দুর্যোগের সময় সুন্দরবন আমাদের আগলে রাখে, সুতারং- ‘রাজস্ব আদায় বাড়ানোর জন্য বনকে কোনো ভাবে যেন ধ্বংস করা না হয় সে বিষয়টিকে সবার গুরুত্ত দিতে হবে।

এ বিষয়ে চাঁদপাই রেঞ্জ কর্মকর্তা এনামুল হক বলেন, শরনখোলা রেঞ্জে গোলপাতা আহরনের কোন অনুমতি এবার ছিল না। তার পরে এ ধরনের ঘটনা ঘটে থাকলে তা দুঃখ জনক।

তবে, আমার রেঞ্জে তদারকির ক্ষেত্রে কোন ঘাটতি ছিলনা। তার পরেও নজর এড়িয়ে বাওয়ালীরা হয়তো কিছু জ্বালান কাঠ নিতে পারে। তবে, এ বিষয়ে জানতে শরনখোলা রেঞ্জের সহকারী বন- সংরক্ষক জয়নাল আবেদীনের মুঠোফোনে কল করা হলে তিনি তেলে-বেগুনে জ্বলে ওঠেন এবং বলেন, সুন্দরবনে কখোন কি হয় তার জবাব কোন সাংবাদিকের কাছে দিতে আমি বাধ্য নই।

আমার রেঞ্জের সব কিছু বন-বিভাগের উর্ধতন কর্তৃপক্ষরা জানেন। তাছাড়া পত্রিকায় লিখলে আমার কিছুই হবে না বলে সংযোগটি বিছিন্ন করে দেন। মেহেদী হাসান, শরনখোলা (বাগেরহাট) প্রতিনিধি