ইতিহাস-ঐতিহ্যের স্বপ্নপুরী নওগাঁ শুভ জন্মদিন -১লা মার্চ

Naogaon

ইতিহাস-ঐতিহ্য ভরপুর নওগাঁ আজ তার জন্মদিন। যেখানে ভোরের শিশিরে পা ভিজে মন ভরে ওঠে নতুন এক আনন্দে, সুন্দর লীলাময় কারুময় নওগাঁ
নওগাঁ বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের রাজশাহী বিভাগের একটি জেলা

স্থানাঙ্ক : ২৪০৭/ -২৪৪৩/ উত্তর অক্ষাংশ ৮৮১৭/ -৮৮৫৮/দ্রাঘিমাংশ।
নওগাঁ শব্দর উৎপত্তি হয়েছে ‘নও’ (নতুন -ফরাসী শব্দ ) ও‘ গাঁ’ (গ্রাম ) শব্দ দু’টি হতে । এই শব্দ দু’টির অর্থ হলো নতুন গ্রাম । অসংখ্য ছোট ছোট নদীর লীলাক্ষেত এ অঞ্চল,আত্রাই নদীর তীরবর্তী এলাকা নদীর প্রন্তর এলাকাকে ঘিরে নতুন একটি গ্রামে পরিনিত হয় , কালক্রমে তাই নওগাঁ শহর এবং সর্বশেষ নওগাঁ জেলায় রূপান্তরিত হয়।

নওগাঁ শহর ছিল রাজশাহী জেলার অন্তর্গত এলাকাটি গ্রাম থেকে থানা থানা থেকে মহকুমায় রূপনেয় ১৯৮৪সালের ১ লা- মার্চ নওগাঁ মহাকুমা ১১ টি উপজেলা নিয়ে জেলা হিসাবে আত্ন প্রকাশ করে

উত্তরে ভারতের দক্ষিণ দিনাজপুর, দক্ষিণে বাংলাদেশের নাটোর ও রাজশাহী, পূর্বে জয়পুরহাট ও বগুড়া জেলা এবং পশ্চিমে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মালদহ ও বাংলাদেশের চাঁপাই নবাবগঞ্জ জেলা।

এর আয়তন ৩,৪৩৫.৬৭ বর্গকিলোমিটার (১,৩২৬.৫২ বর্গমাইল) । এই জেলার ১১টি উপজেলা নয়টি। এই উপজেলাগুলো হলো− পত্নীতলা, ধামইরহাট, মহাদেবপুর, পোরশা, সাপাহার, বদলগাছী, মান্দা, নিয়ামতপুর, আত্রাই, রাণীনগর ও নওগাঁ সদর। এই জেলার ইউনিয়ন ৯৯টি, পৌরসভা ৩টি এবং গ্রাম ২৮৫৪টি।

২০০১ খ্রিষ্টাব্দের আদম শুমারী অনুযায়ী ২৩,৮৫,৯০০ জন ( পুরুষ-১২,৩০,০০০ জন এবং মহিলা-১১,৫৫,৯০০জন)।

নদ-নদী : ছোট যমুনা, আত্রাই, পুনর্ভবা ।

ভূপ্রকৃতি : সমগ্র নওগাঁ জেলার ভূপ্রকতিকে তিনট ভাগে ভাগ করা হয়েছে। এই ভাগ তিনটি হলো−

বরেন্দ্র অঞ্চল: পৌরাণিক উপকথা অনুসারে বলা হয়, দেবরাজ ইন্দ্রের বরে উত্তরবঙ্গের বরেন্দ্রভূমি সৃষ্টি হয়েছিল। এই নওগাঁ এই বরেন্দ্রভূমির অংশ। মধ্যযুগের মুসলমান ঐতিহাসিকগণ সংস্কৃত বরেন্দ্র বা বরেন্দ্রীকে বলতেন বরিন্দ। স্থানীয় ভাষায় এই ‘বরিন্দ’ এলাকা খিয়ার নামে সমধিক পরিচিত।

‘খিয়ার’ শব্দের অর্থ ক্ষীরাভ অর্থাৎ ক্ষীরের আভার ন্যায়। এই জেলার এগারোটি উপজেলার মধ্যে সাতটি উপজেলা নিয়ে নওগাঁ জেলার যে প্রধান অংশ গঠিত, তা বরেন্দ্র অঞ্চলের কেন্দ্র বলা যায়।

সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের সমভূমি অঞ্চলে অবস্থিত হলেও এই জেলার ভূমি যথেষ্ট উঁচু নীচু, ঢেউ খেলানো। এর উচ্চতর ভূমি হরিদ্রাভ এবং মাটি লাল কঙ্করময়। বর্ষাকালে এই মাটি পিচ্ছিল ও আঠাল হয়।

তাই বর্ষাকালে এই অঞ্চলের ভূমি কাদাযুক্ত হয়ে থাকে। কিন্তু শুষ্ক মৌসুমে এই মাটি অত্যন্ত রূক্ষ ও শক্ত হয়ে থাকে।। এই অঞ্চলে নিয়ামতপুর, পোরশা, সাপাহার এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির গভীরতা সাধারণের উচ্চতার চেয়ে অনেক বেশি।

বিল বা ভর অঞ্চল : এই জেলার মহাদেবপুর থানার পূর্ব ও পশিচমাঞ্চল সাপাহার ও পোরশার উত্তর পশ্চিমাঞ্চল তথা জবই ও রোকনপুরের বিল, মহাদেবপুর থানার পশ্চিমাবর্তী ছাতরার বিল, বিল ঠাকুরমান্দা ও উথরাইলসহ মান্দা থানার দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চল এবং বিল রক্তদহসহ রাণীনগরের উত্তর-পূর্ব ভাগের কিছু অংশ এবং আত্রাই থানার পূর্ব-দক্ষিণ অঞ্চলের নিম্নাংশ নিয়ে নওগাঁ জেলার বিল অঞ্চল গঠিত। বর্ষাকালসহ বছরের ৪ থেকে ৬ মাস এসব এলাকা জলমগ্ন থাকে। গ্রামগুলো দেখায় বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো। শুকনা মৌসুমে শক্ত ও রূক্ষ মাটি দেখা যায় ।

পলি অঞ্চল : ছোট যমুনা তীরবর্তী আত্রাই থানার পূর্ব তীরবর্তী রসুলপুর, মির্জাপুর, রাণীনগর থানার ঘোষগ্রাম, বেতগাড়ি থেকে কুজাইল, ত্রিমোহনী, নওগাঁ থানার চণ্ডিপুর, বোয়ালিয়া, আদমদুর্গাপুর ও পশ্চিম তীরবর্তী শৈলগাছী, মকিমপুরসহ নওগাঁ পৌর এলাকা এবং নওগাঁ থেকে বদলগাছী থানা এলাকা পর্যন্ত বক্তারপুর, কীর্তিপুর, বালুভরা প্রভৃতি দুই তীরবর্তী অঞ্চল এবং ধামইরহাট, পত্নীতলা, মহাদেবপুর থানার আত্রাই তীরবর্তী কিছু অঞ্চল নিয়ে মোটামোটিভাবে নওগাঁ জেলার পলি অঞ্চল গঠিত। এইসব এলাকার মাটি দোআঁশ এবং খুবই উর্বর। বছরে তিনটি ফসল ফলে।

জলবায়ু:
তুলনামূলকভাবে এই জেলায় কম হয়। জেলার নীতপুর, সাপাহারে বৃষ্টি হয় সবচেয়ে কম এবং রাণীনগর, আত্রাই,নওগাঁয় সবচেয়ে বেশি। ফলে বরিন্দ অঞ্চলে অনাবৃষ্টি প্রধান সমস্যা, আর ভর অঞ্চলে প্রধান সমস্যা বন্যা। ভূমির গঠন ও বৃষ্টিপাতের তারতম্য অনুসারে খরা মৌসুমে নওগাঁ জেলার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে মাটি যেমন রূক্ষ হয়, আবার শীতের সময় তীব্র শীত অনুভূত হয়। গ্রীষ্মের সময় এই অঞ্চলের বাতাস বেশ উষ্ণ হয়ে উঠে। বিল বা ভর অঞ্চলের মাটি প্রায় সারা বছরই স্যাঁতসেতে এবং সেই কারণে কিছুটা অস্বাস্থ্যকরও বটে।

শীত ও গ্রীষ্মে এই জেলার তাপমাত্রায় যথেষ্ট হ্রাসবৃদ্ধি ঘটে। সাধারণভাবে নওগাঁর আবহাওয়া নাতিশীতোষ্ণ। এই জেলায় ঝড়ের তাণ্ডব খুব বেশি পরিলক্ষিত হয় না। শীতকালে ঘন কুয়াশা পড়ে এবং চৈত্র বৈশাখে ধূলি ঝড়ি হয়।

মুক্তিযুদ্ধে নওগাঁ
১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের ৭ই মার্চ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান -এর ঐতিহাসিক ভাষণের পরপরই নওগাঁয় সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ গড়ে ওঠে। এই সময় নওগাঁ কে,ডি,সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের কার্যালয় স্থাপিত হয়। সে সময় নওগাঁ ছিল ইপিআর ৭নং উইং এর হেড কোয়ার্টার।

১৮ই মার্চ পর্যন্ত এর কমান্ডিং অফিসার ছিল পাঞ্জাবি মেজর আকরাম বেগ। এই সেনাদলে ২জন ক্যাপ্টেনের একজন নাভেদ আফজাল ছিলেন পাঞ্জাবি, অন্যজন ক্যাপ্টেন গিয়াস উদ্দিন ছিলেন বাঙালি।

২৩শে মার্চ নওগাঁয় স্বাধীনতা আন্দোলনের ওপর অধ্যাপক খন্দকার মকবুল হোসেন রচিত ‘রক্ত শপথ’ নামে একটি নটক মঞ্চস্থ হয়। এ নাটকে স্বাধীনতা সংগ্রামের ভবিষ্যৎ রূপরেখা সম্পর্কে আভাস দেয়া হয়েছিল।

নাটকটি প্রযোজনা করেছিলেন মো: আব্দুল জলিল, নির্দেশনায় ছিলেন মমিন-উল-হক ভুটি। মঞ্চস্থ হয় নওগাঁ বি.এম.সি. কলেজ প্রাঙ্গনে। পরবর্তীকালে এ নাটকটি ভারতের বালুরঘাট, মালদহ ও শিলিগুড়ির বিভিন্ন স্থানে মঞ্চস্থ হয়। ভারতের মাটিতে এটি যৌথভাব মঞ্চস্থ করে বাংলাদেশের শরণার্থী শিল্পী-সাহিত্যিক গোষ্ঠী ও বাংলাদেশ শিল্পী-সাহিত্যিক সংঘ।

২৫শে মার্চের আগেই মেজর আকরাম বেগের জায়গায় বাঙালি মেজর নজমুল হক নওগাঁয় ইপিআর এর কমান্ডিং অফিসার হিসেবে বদলি হয়ে আসেন। এই সময় মেজর বেগ তাঁকে বাঙালি অফসারের কাছে চার্জ বুঝিয়ে দিতে গড়িমসি করেন।

এরপর মেজর নজমুল হক তৎকালীন আওয়ামী লীগের তরুণ নেতা মো: আব্দুল জলিলের সাথে পরামর্শে− বাঙালি ইপিআরদের সহায়তায় ২৪শে মার্চ মেজর আকরাম বেগ ও ক্যাপ্টেন নাভেদ আফজালকে গ্রেফতার করেন।

এর পাশাপাশি তিনি নওগাঁ মহকুমা অবাঙালি প্রশাসক নিসারুল হামিদকেও গ্রেফতার করেন। ফলে ২৪শে মার্চে নওগাঁ বাংলাদেশের মুক্ত এলাকায় পরিণত হয়। উল্লেখ্য সে সময় নওগাঁ ছিল রাজশাহী জেলার একটি মহকুমা।

রহমতউল্লাহ আশিকুর জামান নুর,নওগাঁ প্রতিনিধি