আখেরি মোনাজাতে শেষ হলো বিশ্ব ইজতেমার ৫৬তম আসর

আখেরি মোনাজাতের মধ্যদিয়ে শেষ হলো দ্বিতীয় পর্বের বিশ্ব ইজতেমার

Generic placeholder image
  Ashfak

আখেরি মোনাজাতের মধ্যদিয়ে শেষ হলো তাবলিগ জামাত আয়োজিত ৫৬তম বিশ্ব ইজতেমা ২০২৩ এর দ্বিতীয় পর্ব। আখেরি মোনাজাতের সময় আমিন, আল্লাহুম্মা আমিন ধ্বনিতে কহর দরিয়া তুরাগ নদের তীর মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো টঙ্গী উত্তরা এলাকা। আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় লাখ লাখ মুসল্লিরা আকুতি জানান। অনেকে কেঁদে কেঁদে মহান আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে দেখা যায় মুসল্লিদের। বিশ্ব শান্তির জন্য দোঁয়া করেন। রোববার দুপুর সোয়া ১২টার দিকে আখেরি মোনাজাত শুরু হয়ে ১২টা ৪৫ মিনিটে শেষ হয়। আখেরি মোনাজাত পরিচালনা করেন দিল্লির মাওলানা সাদ কান্ধলভীর বড় ছেলে মাওলানা ইউসুফ কান্ধলভী। এর আগে তিনি হেদায়েতি বয়ান করেন। হেদায়েতি বয়ান বাংলায় তরজমা করেন মাওলানা আব্দুল্লাহ মনসুর। রোববার ২২জানুয়ারি বাদ ফজর দিল্লির মোরসালিন নিজামুদ্দিনের বয়ানের মধ্যদিয়ে ইজতেমার তৃতীয় দিন শুরু হয়। তাৎক্ষণিকভাবে বয়ান বাংলায় তরজমা করেন বাংলাদেশের মাওলানা আশরাফুল। বয়ানের পর নাস্তার বিরতি দিয়ে ৯টা থেকে মাওলানা মোশাররফ তালিম করবেন। সাড়ে ৯টা থেকে শুরু হয় হেদায়েতের কথা। ৬২ দেশের প্রায় ৮ হাজার ও দেশের লাখ লাখ মুসল্লির আগমনে মুখর ইজতেমা ময়দানসহ টঙ্গীর আশপাশ ময়দান। ময়দানের আশপাশে যে যেখানে দাঁড়িয়ে বা বসেছিলেন সেখান থেকেই হাত তুলেন আল্লাহর দরবারে। অনেকে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। মুঠোফোন ও স্যাটেলাইট টেলিভিশন, ফেসবুক লাইভ, এফএম রেডিও, হ্যান্ড মাইক, মসজিদের বড় মাইক ও অনলাইনের মাধ্যমে আখেরি মোনাজাতে অংশ নিয়েছেন। টেলিভিশন ও রেডিওতে সরাসরি সম্প্রচারের কারণে দেশ-বিদেশের লাখ লাখ মানুষ একসঙ্গে হাত তোলেন আল্লাহর দরবারে। আখেরি মোনাজাত উপলক্ষে উত্তরা, টঙ্গী, গাজীপুরসহ আশপাশের এলাকার সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মার্কেট, বিপণি- বিতান বন্ধ ছিলো তবে শিল্প কলকারখানা খোলা ছিলো। আমিন আমিন ধ্বনিতে মুখরিত তুরাগ তীর: টঙ্গীর ঐতিহ্যবাহী কহর দরিয়া তুরাগ নদের তীরে লাখো ধর্মপ্রাণ মুসল্লিদের উপস্থিতিতে শুরু হয় বিশ্ব ইজতেমার আখেরি মোনাজাত। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলার প্রান্ত থেকে দলে দলে মানুষ ছুটে এসেছেন আখেরী মোনাজাতে শরিক হতে। রোববার সকাল থেকেই আখেরি মোনাজাতের কারণে ইজতেমা মাঠের আশপাশের সড়কের যান চলাচল নিয়ন্ত্রিত ছিল। যারা ইজতেমার ময়দানে পৌঁছাতে পারেননি তারা পথে-ঘাটে, বাস, রিকশা, আশপাশের মসজিদ, দোকান-পাটে বসে মোনাজাতে অংশ নিয়েছেন। সম্মিলিত আমিন, আমিন ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠেছে পুরো ইজতেমা ময়দান। সর্বস্তরের মানুষ অশ্রুসিক্ত নয়নে আল্লাহ তাআলার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। সেই প্রার্থনার তরঙ্গ এসে মিলেছে দূর-দূরান্তে হাত উঠানো মানুষের মাঝেও। মোনাজাতে নিজেদের হৃদয়ের আবেগ-অনুভূতি আল্লাহর কাছে তুলে ধরেছেন, অন্তর থেকে আমিন, আমিন ধ্বনি আর চোখের পানিতে বুক ভাসিয়েছেন তারা। আব্দুল্লাহপুর ব্রিজের পাশে মসজিদ, টঙ্গীর দত্তপাড়া, আরচিপুর, আউচপাড়া এলাকার মাইক থেকে ভেসে আসে ইজতেমার ময়দানের আখেরি মোনাজাতের ধ্বনি। আমিন, আমিন ধ্বন্নিতে মুখরিত ও কম্পিত হয়ে উঠে পুরো টঙ্গী ও উত্তরা অঞ্চল। আখেরি মোনাজাতে দল বেঁধে নারীরা: টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমার দ্বিতীয় পর্বে আখেরি মোনাজাতে অংশ নিতে ইজতেমা ময়দানের আশপাশে এসেছেন নারী মুসল্লিরা। নারীরা দল বেঁধে শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার জেনারেল হাসপাতাল, স্টেশন রোড, পূর্ব থানা গেইট এলাকা ও বাটা গেইটসহ আশপাশের বিভিন্ন অলিগলিতে অবস্থান নিয়ে বসেছিলেন আখেরি মোনাজাতে অংশ নিতে। মুসলিম উম্মাহর দ্বিতীয় বৃহত্তম জমায়েত বিশ্ব ইজতেমার দ্বিতীয় পর্বের সমাপ্তি হলো। টঙ্গীর কহর দরিয়া তুরাগ নদের তীরে আখেরি মোনাজাতের মধ্যদিয়ে শেষ হলো বিশ্ব ইজতেমার দ্বিতীয় পর্ব। মোনাজাতে অংশ নিতে পুরুষদের পাশাপাশি যোগ দিতে দেখা গেছে হাজার হাজার নারী মুসল্লিদের। রোববার ২২জানুয়ারি ভোর থেকেই রাজধানী ঢাকাসহ গাজীপুরের সব পথ লোকে লোকারণ্য। ময়দানের চারপাশে লাখ লাখ মুসল্লির পদধ্বনিতে কহর দরিয়া তুরাগ নদের আশপাশ রূপ নিয়েছে এক বিশাল কাফেলায়। বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বাচ্চাসহ নারী-পুরুষ সবাই দলবেঁধে এসেছেন ইজতেমা ময়দানে। সকালে টঙ্গী ইজতেমা ময়দানের উদ্দেশে এসে হোসেন মার্কেট নামেন শিল্পী আক্তার নামের এক নারী। সঙ্গে আছে ছেলের বউ কুলসুম আর মেয়ে ফারহানা। হোসেন মার্কেট থেকে হেঁটেই এগিয়ে চলেছেন তারা, সঙ্গে যাচ্ছেন আরও কয়েকটি নারীদের দল, যাবেন আখেরি মোনাজাতে অংশ নিতে। টঙ্গী পূর্ব থানার গেইটে দাঁড়িয়ে বা বসে মোনাজাতে অংশ নিবো। আমার মেয়ে আর ছেলের বউকে সঙ্গে এনেছি। এখানে এসে দেখছি আমাদের মতো হাজার হাজার নারী মুসল্লিরাও এসেছেন মোনাজাতে অংশ নিতে। কে জানে আল্লাহ কার উছিলায় আমাদের দোঁয়া কবুল করেন। দ্বিরাশ্রম এলাকা থেকে মোনাজাতে এসেছেন খাদিজা বেগম (৭০), উনার সঙ্গে আরো ৮/৫ জন বয়স্ক নারী। তিনি জানান, প্রতিবার আখেরি মোনাজাতের দিন চলে আসি। বনমালা হয়ে শহীদ আহসান উল্লাহ মাষ্টার জেনারেল হাসপাতাল মাঠে এসে পৌঁছেছি। কোন ক্লান্তির ছাপ নেই তার। প্রতি বছর ইজতেমায় এসে আখেরি মোনাজাতে অংশ নিই। আমরা দলবেঁধে পাড়ার নারীরা আসি। আজও সেই লক্ষ্যে এসেছি। আশুলিয়া থেকে এসেছেন লাইলী আক্তার। তিনি বলেন, আমরা ৯ জন নারী আখেরি মোনাজাতে অংশ নিতে ভোরে এসেছি। ১০ টাকায় পলিথিন কিনে সড়কের পাশে বাটা বিক্রয় কেন্দ্রের সামনে বসেছি। রাজধানীর উত্তরা থেকে এসেছেন আফরিনা বেগম। তিনি বলেন, অসুস্থ স¦ামী ও সন্তানের রোগমুক্তি কামনা করতে আমি ইজতেমা মাঠে এসেছি। আমি আমার স্বামী সন্তানের জন্য দোঁয়া চাইব আল্লাহর কাছে। আমার সঙ্গে আরও ৪ জন নারী ইজতেমা ময়দানে এসেছেন আখেরি মোনাজাতে অংশ নিতে। মা বাবা পরিবার-স্বজনদের জন্য দোঁয়া করতে ইজতেমা ময়দানে মুসল্লিরা : ভাই ভাতিজা ছেলেদের সঙ্গে নিয়ে দ্রুত ছুটছেন পুবাইলের আব্দুল আউয়াল নামে এক কৃষক। উদ্দেশ্য ইজতেমা ময়দান। আব্দুল আউয়াল জানান, লাখ লাখ ধর্মপ্রাণ মুসল্লিদের সমাগম ইজতেমা ময়দানে। মা বাবা ছেলে মেয়ে এবং নিজের জন্যসহ পরিবারের জন্য দোঁয়া চাইবো। নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের দোঁয়া কবুল করবেন। আউয়ালের মতো অনেক মানুষই ছুটে এসেছেন, যে যেভাবে পেরেছেন এসেছেন ইজতেমা ময়দানে আখেরি মোনাজাতে। দেখা গেছে, পিকআপ ভ্যান, রিকশা, অটোরিকশা ও বাসে চেপে ইজতেমার আখেরি মোনাজাতে অংশ নিতে ছুটে এসেছেন সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষজন। কথা হয় মো. হুমায়ুন কবীর নামে এক ঝুট ব্যবসায়ী যুবকের সঙ্গে। নিজেই নিজের ব্যবসা দেখাশোনা করেন তিনি। হুমায়ুন বলেন, পরিবার পরিজনেক দুরে রেখে জীবিকার সন্ধ্যানে শহরে পড়ে থাকা। পরিবারের লোকজনের জন্য দোঁয়া চাইবো। নিজের জন্যও। আত্মীয়-স্বজনদের মধ্য অনেকে অসুস্থ। তাদের সুস্থতা কামনা করবো। দত্তপাড়া এলাকার বাসিন্দা বিউটি বেগম নামে একজন বলেন, আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করবো গুনাহ মাফের। জীবনে অনেক পাপ করেছি। জমা পাপের শাস্তি মওকুফ, বাকি জীবনটা ঈমান আমলের সঙ্গে চলা, স্বামী সন্তান নিয়ে যাতে ভালো থাকি আল্লাহর নিকট সেই ফরিয়াদ করবো। দেশ-বিদেশের লাখো মুসল্লির সঙ্গে ইজতেমা ময়দানে হাত তুলবো আল্লাহর কাছে। যদি আল্লাহর কৃপা পাই। টঙ্গীর কহর দরিয়া তুরাগ নদের তীরে মুসলিম উম্মাহর দ্বিতীয় বৃহত্তম জমায়েত বিশ্ব ইজতেমার দ্বিতীয় পর্ব শেষ হলো আখেরী মোনাজাতের মধ্যদিয়ে রোববার দুপুরে। শীত উপেক্ষা করে লাখো মানুষ বিশ্ব ইজতেমার ময়দানে এক ছাতার নিচে জড়ো হন। বিপুল এই মুসল্লির মাঝে ছিলো বহু কিশোর ও মাদরাসা শিক্ষার্থী। ইজতেমায় এসে উচ্ছসিত ক্রিকেটার সোহরাওয়ার্দী-রাজীব-জাভেদ: ইজতেমার এ পর্বে প্রায় ৮ হাজার বিদেশি মেহমানের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মানুষ অংশ নিয়েছেন। এবার মাঠে উপস্থিত ছিলেন- জাতীয় দলের ক্রিকেটার জাভেদ ওমর, সোহরাওয়ার্দী শুভ, শাহাদাত হোসেন রাজীব ও ইলিয়াস সানিসহ অনেকে। ক্রিকেটারদের সবাই মুফতি ওসামার জামাতের সঙ্গী হিসেবে ময়দানে অবস্থান করেছেন। তাদের মধ্যে সোহরাওয়ার্দী শুভ এক চিল্লার সাথী। বাকিরাও ইজতেমা থেকে নিয়ত করেছেন তাবলিগে সময় দেওয়ার। মুফতি ওসামার এ জামাতে যোগ দিয়েছেন চিত্রনায়ক ইমনও। তিনিও ইজতেমার শুরু থেকে শেষ অবধি সময় দিয়েছেন বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। রোববার ২২ জানুয়ারি জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক মাশরাফি বিন মোর্তাজাও এ জামাতের সঙ্গে আখেরি মোনাজাতে অংশ নিয়েছেন। ইজতেমা প্রসঙ্গে জাতীয় দলের সাবেক ওপেনার জাভেদ ওমর বলেন,আমি আজই ময়দানে এসেছি। আমি সব সময়ই তাবলিগের সাথে সম্পৃক্ত থাকি। ইজতেমার ময়দান একটা ব্যতিক্রমী জায়গা। এখানে ইচ্ছা হলেই আপনি বেফাস কথা বলতে পারবেননা।ইচ্ছা করলেই রাগ করতে পারবেননা। মানুষের প্রতি বিনয়ী হওয়ার এক জীবনমুখী শিক্ষা রয়েছে এখানে। জাভেদ বলেন, আমরা সবাই খাবার খেতে গেলে একটি চামচ ১০ বার পরিষ্কার করি। হাত বার বার পরিষ্কার করি। পৃথক পৃথক ভাবে খাবার খাই। কিন্তু এখানে সবাই একত্রিত হয়ে খাবার খাচ্ছি, একই গ্লাসে পানি খাচ্ছি। এখানে কে রাজার ছেলে আর কে রিকশাচালক তার হিসাব চলে না। এতেই সমাজের কাছে একটা বার্তা যায় যে- দিন শেষে আমরা সবাই সমান। এই জায়গা তৈরি করা খুব জরুরি। এ কারণেই এসেছি। জীবনবোধের এই জায়গাটা সত্যি গুরুত্বপূর্ণ। সাবেক এই ওপেনার বলেন, মুফতি ওসামা সাহেব আমাকে উত্তম কথা শিখিয়ে দিয়েছেন, বিনয় আর প্রজ্ঞা দিয়ে ইসলামের দিকে ডেকেছেন। আমি অভিভূত। তিনি (ওসামা) জানেন- হাউ টু ইনভাইট পিপল টু আল্লাহ। কখনো ফোর্স না করে ভালোবাসা দিয়ে তার এই আহ্বানও ইসলামের অন্যতম সৌন্দর্য। আমি বরাবরই চেষ্টা করছি তাবলিগে লম্বা সময় দেওয়ার। আমার জন্য দোয়া করবেন। খুব শিগগির লম্বা সময় সফর করব ইনশাআল্লাহ। জাতীয় দলের পেসার শাহাদাত হোসেন রাজীব বলেন, আমি ছোটবেলায় মাদ্রাসার ছাত্র ছিলাম। আমার মায়ের খুব ইচ্ছা ছিল একটি ছেলে ইসলামের পথে থাকুক। কিন্তু মাদ্রাসায় কন্টিনিউ করতে পারিনি। তবে খেলাধুলা যেহেতু বেশি দিন করব না সেহেতু চেষ্টা করছি দ্বীনের সাথে সম্পৃক্ত থাকার। তিনি বলেন, শিখছি কীভাবে মানুষকে আল্লাহর পথে ডাকতে হয়। কীভাবে ইসলাম প্রচার করতে হয়। জানতে চেষ্টা করছি, আমাদের নবী (সা.) কীভাবে ইসলাম প্রচার করেছেন। কষ্ট সহ্য করেছেন। এগুলো শেখা গুরুত্বপূর্ণ সকলের জন্য। জানতে চাইলে মুফতি উসামা ইসলাম বলেন, বিশ্ব ইজতেমার দ্বিতীয় পর্বে বাংলাদেশ জাতীয় টিমের সোহরাওয়ার্দী শুভ, শাহাদাত হোসেন রাজীব, ইলিয়াস সানিসহ পূর্ণ ৩ দিন সময় দিয়েছেন। আমি তাদের সাথে দাওয়াতে মেহনতের গুরুত্ব সম্পর্কে আলোচনা করেছি। পাশাপাশি তারাও ইজতেমায় এসে বেশ উচ্ছ্বসিত। আল্লাহ তাদের কোরবানিকে কবুল করুন। মহাসড়কে মুসল্লিদের অবস্থান-বন্ধ ছিলো যান চলাচল: টঙ্গীর কহর দরিয়া তুরাগ নদের পারে মুসলিম উম্মাহর দ্বিতীয় বৃহত্তম জমায়েত বিশ্ব ইজতেমার দ্বিতীয় পর্ব রোববার আখেরি মোনাজাতের মধ্যদিয়ে শেষ হয়েছে। আখেরি মোনাজাত উপলক্ষ্যে রোববার সকাল থেকে মুসল্লিরা ময়দানের দিকে আসতে শুরু করেন। সকালে মুসল্লিদের চাপ কম থাকায় পুলিশি নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে ভোগড়া বাইপাস থেকে টঙ্গীর আব্দুল্লাহপুর পর্যন্ত পণ্যবাহী গাড়ি ব্যতীত যাত্রীবাহী বিভিন্ন পরিবহন চলতে দেখা গেছে। বেলা বাড়ার সাথে সাথে মুসল্লি বাড়তে থাকায় ইজতেমা ময়দান ছাড়িয়ে মহাসড়কে মুসল্লিরা অবস্থান নিতে দেখা যায়। এতে বন্ধ হয়ে যায় সকল প্রকার যান চলাচল। এছাড়াও বিভিন্ন যাত্রীবাহী পরিবহন বাস, সিএনজি, পিকআপ, অটোরিকশাকে আখেরি মোনাজাত শেষে ঘরে ফেরা যাত্রীদের অপেক্ষায় ময়দানের আশপাশে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। শ্যামলী পরিবহনের চালক জলিল মিয়া জানান, ভোররাত ৪টায় ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট থেকে টঙ্গীর উদ্দেশ্যে বাস নিয়ে এসেছি মুসল্লিদের নির্বিঘেœ যাতায়াতের জন্য। সকালে মহাসড়কে জ্যাম না থাকায় কোথাও কোনো বাধা ছাড়াই মাঠ পর্যন্ত আসতে পেরেছি। আখেরি মোনাজাত শেষ করে মুসল্লি যাত্রীদের নিয়ে ময়মনসিংহের উদ্দেশ্য রওনা দেব। ইজতেমার দ্বিতীয় পর্বের আখেরি মোনাজাতে অংশ নিতে এসেছেন আবুল কালাম আজাদ। তিনি বলেন, আমি চাকরির সুবাদে মাওনা থাকি। পাশেই এতো বড় আয়োজন। আল্লাহকে রাজি খুশি করতে এসেছি। সকালে আসতে কোনো দুর্ভোগ হয়নি। এখন যান চলাচল বন্ধ আছে তবে খোলা পর চলে যাবো। মোনাজাতে অংশ নিতে আসা ত্রিশালের সালাম মিয়া জানান, অন্যান্য ইজতেমায় আখেরি মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয় সকাল ১০টায়। সকাল ৯ টায় খবর পেলাম এ পর্বের আখেরি মোনাজাত বেলা ১২টায়। চলে এলাম। মোনাজাতে অংশ নিলাম। ইজতেমায় আগতদের বসতে বিনামূল্যে কাগজ বিতরণ: টঙ্গীর তুরাগতীরে বিশ্ব ইজতেমায় আগতদের বসে বয়ান শোনা ও মোনাজাতে অংশ গ্রহণের জন্য বিনামূল্যে লাইনার পেপার (কাগজ) দিতে দেখা গেছে টঙ্গীর স্থানীয় ধর্মপ্রাণ মুসল্লীদের। এদের মধ্যে টঙ্গী বাজারের কাপড় ব্যবসায়ী শাহজাহান মিয়া ও ষ্টেশন রোডের সজীব এন্টার প্রাইজের মালিক রফিকুল ইসলাম রিপন অন্যতম। দেখা গেছে, টঙ্গী ব্রিজের ওপর রাজধানী থেকে ইজতেমায় আগতদের ডেকে ডেকে বিনামূল্যে লাইনার পেপার (কাগজ) বিতরণ করছেন। প্রথমে কেউ কেউ নিতে না চাইলেও পরে যখন শুনছেন বিনামূল্যে দেয়া হচ্ছে, তখন নিচ্ছেন। অথচ পাশেই চালার চট, পাটি বিক্রি হচ্ছে ১৬০ থেকে ৩৬০ টাকা পর্যন্ত। গফরগাঁওয়ের শাজাহান মিয়াা গত দুই বছর ধরে তার সামর্থ্য অনুযায়ী ইজতেমায় আগত মুসল্লিদের বসার জন্য বিনামূল্যে লাইনার পেপার (কাগজ) বিতরণ করছেন। শাহজাহান মিয়া জানান, ইজতেমায় অনেক দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসেন। তারা বসার জন্য কোন জায়গা পান না। এতে তাদের দোয়া ও মোনাজাতে অংশ নিতে কষ্ট হয়। তাদের কষ্টের কথা চিন্তা করে আমি এই উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। এদিকে সজীব এন্টার প্রাইজের মালিক রফিকুল ইসলাম রিপন ও তার লোকজন বিনামূল্যে ওজুর পানি সরবরাহ ও পত্রিকা সরবরাহ করেছেন মুসল্লিেিদর মাঝে। ইজতেমা যেন হকারদের ঈদ: টঙ্গীর তুরাগ তীরে বিশ্ব ইজতেমায় শত শত নতুন নতুন হকারের মিলনমেলা বসেছিলো ময়দানে। বিকিকিনিতে যেন ইদ লেগেছে হকারদের। লাখ লাখ মুসল্লি দেখে দামও হাঁকাচ্ছেন দ্বিগুণ। রোববার ইজতেমা ময়দান ও আশপাশে দেখা যায়, টঙ্গী এলাকার আশপাশের রাস্তা সব কিছুতে হকার আর হকার। অর্থাৎ হকারদের মিলন মেলা। ইজতেমায় আসা মুসল্লিদের কাছে জায়নামাজ, টুপি, তসবিহ বিভিন্ন খাবার সামগ্রি বিক্রি করেছে হকাররা। এছাড়া বিক্রি করছে শীতের কাপড় যেমন-ব্লেজার, মাপলার, কান-টুপি ইত্যাদি। নিম্নমানের জায় নামাজ বিক্রি করছেন ১০০/১৫০ টাকা। যেটা সাধারণত বিক্রি হয় ৭০/৮০ টাকায়। ৭০ টাকার নামাজের পাটি বিক্রি করছেন ১৬০ টাকা। ১০ টাকার টুপি বিক্রি করছেন ২০ টাকা। ১২০/১৫০ টাকার লম্বা পাটি বিক্রি করছেন ৩০০/৩৬০ টাকা। বাচ্চাদের পাঞ্জাবি বিক্রি হচ্ছে ২০০/৩০০ টাকায়। আর ৩০ টাকার মোজা বিক্রি হচ্ছে ৫০/৮০ টাকায়। এছাড়াও শীতের চাদর বিক্রি করা হচ্ছে ৪০০/৭০০ টাকা পিস এবং ফুটপাতে ব্লেজার বিক্রি হচ্ছে ৩০০/৩০০০ টাকায়। আরও নানা পণ্যও মিলছে ইজতেমা ময়দানের আশেপাশে। ইজতেমার পথে পথে ১০ টাকায় অজুর পানি বিক্রি: ইজতেমা ময়দানের আশপাশে লাখ লাখ মুসল্লিদের ভীঁড়ে নানা ব্যবসার পসরা সাঁজিয়ে বসেছেন মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। এর মধ্যে ১০ টাকায় অজু পানি, ২০ টাকায় মল ত্যাগ, ৩০ টাকায় গোসল করানোও একটি ব্যবসায় রূপ নিয়েছে। পথে পথে বালতি ও ড্রামে পানি ভর্তি করে এনেছেন স্থানীয়রা। সাজিয়ে রেখেছেন ছোট ছোট টুল ও পিঁড়ি। আছে পানি ভরার বদনা। ইজতেমার ময়দান লক্ষ্য নিয়ে যারা পায়ে হেঁটে চলেছেন এমন মুসল্লিদের জন্য এই অজুর পানি। বিনিময়ে প্রতি মুসল্লিদের কাছ থেকে ১০ টাকা করে নেওয়া হয়। এছাড়া মল ত্যাগ, প্রস্ধসঢ়;্রাব করার জন্য ২০ টাকা এবং বিশেষ প্রয়োজনে গোসল করতে চাইলে ৩০ টাকা দিতে হয়েছে তাদের। ইজতেমা ময়দানের পথে টঙ্গী ব্রিজ পেরিয়ে টঙ্গীর মিল গেইট বাজার পযর্ন্ত দেখা গেছে এসব ব্যবসায়ীদের। টঙ্গী সড়ক উপ-বিভাগের সামনে এমন অজুর আয়োজন সাঁজিয়ে বসেছেন স্থানীয় সাদিকুর রহমান। তিনি বলেন, বালতি ও ড্রাম ভরে পানি এনে এখানে মুসল্লিদের অজু করানোর ব্যবস্থা করেছি। টুলে বসার ব্যবস্থা আছে। সেই সঙ্গে প্রতি টুলের সামনে একটি করে বদনা রাখা হয়েছে। যেসব মুসল্লি এখানে এসে অজু করছেন তাদের কাছে ১০ টাকা করে নিয়েছি। আসলে পানি আনার খরচসহ নানান খরচ লেগেছে। ফলে মুসল্লিদের কাছ থেকে ১০ টাকা করে নিয়েছি। আমার মতো এমন অজু করানোর আয়োজন করেছে অনেকেই। ইজতেমা থেকে ফিরতে পথে পথে ভোগান্তি, ভাড়া নিচ্ছে দ্বিগুণ: যানজট কম থাকায় বেশ স্বাচ্ছন্দ্যেই দ্বিতীয় পর্বের ইজতেমায় এসেছিলেন মুসল্লিরা। তবে আখেরি মোনাজাত শেষে ফেরার পথে ভোগান্তিতে পড়েছেন মুসল্লিরা। যাত্রীবাহী বাসে প্রচন্ড ভিড় থাকায় দলে দলে পায়ে হেঁটে গন্তব্যের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেছেন অনেকে। পথিমধ্যে অনেকে আবার মোটরসাইকেল, ভ্যান, অটোরিকশা ও পিকআপে চড়ে রওনা করছেন। এক্ষেত্রে দ্বিগুণ ভাড়া গুনতে হচ্ছে তাদের। টঙ্গী উত্তরার বিভিন্ন বাস স্ট্যান্ডে গিয়ে দেখা যায়, আখেরি মোনাজাত শেষ হতে না হতেই বাড়ি ফিরতে হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন মুসল্লিরা। কিন্তু সেই অনুযায়ী রাস্তায় পর্যাপ্ত বাস নেই। যে কয়টি বাস রয়েছে, সেগুলোও দূরের যাত্রীদের নিচ্ছে। এছাড়া বাসগুলো ভাড়াও নিচ্ছে দ্বিগুণ। বিমানবন্দর, মহাখালী ও মগবাজার হয়ে সায়েদাবাদ রুটে চলাচল করে বলাকা পরিবহন। এই লোকাল বাসটি ১০০ টাকার নিচে কোনো যাত্রী নিচ্ছে না। কেউ যদি মহাখালী নামেন তাকেও ১০০ টাকা দিতে হবে বলে জানানো হয়। ফলে বাধ্য হয়ে দ্রুত গন্তব্যে ফিরতে ১০০ টাকা দিয়েই বাসে উঠছেন যাত্রীরা। এদিকে রাইদা, ভিক্টর ক্লাসিক, তুরাগ ও অনাবিলসহ রাজধানীতে চলাচলকারী পরিবহনগুলোর ক্ষেত্রে একই দৃশ্য দেখা গেছে। নির্ধারিত গন্তব্যে পৌঁছাতে যাত্রীদের কাছ থেকে দ্বিগুণ ভাড়া নিচ্ছে বাসগুলো। এয়ারপোর্ট থেকে খিলক্ষেত পর্যন্ত ৫০ টাকা করে ভাড়া নিচ্ছে পিকআপগুলো। আর রামপুরা পর্যন্ত নিচ্ছে ১০০ টাকা করে। মোটরসাইকেলে চড়ে গন্তব্যে যেতে গুনতে হচ্ছে সর্বনিম্ন ৩০০ টাকা। আর যারা যাত্রাবাড়ী, গুলিস্থান কিংবা সদরঘাট যাচ্ছেন, তাদের কাছ নিচ্ছে ৫০০-৭০০ টাকা। তবে বেশিরভাগ যাত্রীদের পায়ে হেঁটে হেঁটে দলে দলে ইজতেমা মাঠ ছাড়তে দেখা গেছে। এই অবস্থায় বিপাকে পড়েছেন ইজতেমা ময়দান থেকে কম দূরত্বের এয়ারপোর্ট, খিলক্ষেত, বাড্ডা ও রামপুরাসহ আশপাশের এলাকার মুসল্লিরা। উপায় না পেয়ে অটোরিকশা, ভ্যান ও পিকআপে চড়ে গন্তব্যের উদ্দেশে ছুটছেন তারা। আবার এগুলোর কোনোটিতেই চড়ার সুযোগ না পেয়ে দলে দলে পায়ে হেঁটে ফিরছেন অনেকে।

মৃণাল চৌধুরী সৈকত, টঙ্গী 

মন্তব্য করুন হিসাবে:

মন্তব্য করুন (0)